Sat, Aug 29, 2026 পাঠ ৩ দিব্যেন্দু-সরকার সাহিত্য | প্রথম | উপক্রমণিকা ৪র্থপত্র-২য়অর্ধ

আমি দিব্যেন্দু সরকার। আজকে আমার ক্লাস নেওয়ার কথা। অভ্রদা আমাকে জানিয়েছেন এই শিক্ষাবর্ষে আমার আপনাদের পড়ানোর কথা ‘সাহিত্য’, রবীন্দ্রনাথের ‘সাহিত্য’ গ্রন্থখানি আর ‘তপতী’ এই নাটক। এই দুটি গ্রন্থ আমার পড়ানোর কথা।

আমি ‘সাহিত্য’ দিয়েই শুরু করব। অর্থাৎ যে গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যতত্ত্ব সংক্রান্ত আলোচনা করেছেন, সেই বিষয়টা দিয়েই শুরু করব। আমার বিশ্বাস এটাই যে আগে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যতত্ত্ব যদি আমরা একটু ঠিকঠাক করে জেনে নিই, তাহলে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য বুঝতে আরও একটু সুবিধা হবে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য বুঝতে গেলে রবীন্দ্র-সংস্কার থাকার কথা বলেছিলেন জগদীশ ভট্টাচার্য। আমারও বিশ্বাস যে রবীন্দ্র-সংস্কার যথাযথ না থাকলে অন্তর্দৃষ্টি আসে না, ফলত রবীন্দ্র সাহিত্যের ঢাকনা ঠিকঠাক ভাবে উন্মোচিত হয় না।

সেই সূত্রেই আগে রবীন্দ্রনাথ নিজে সাহিত্য সম্পর্কে কি বোঝেন এবং আমাদেরকে কি জানাতে চেয়েছেন, সেই জায়গাটা আমরা স্পষ্ট করে নিতে চাই।

আমি প্রাথমিকভাবে আজকে আপনাদের এই ‘সাহিত্য’ গ্রন্থের প্রকাশ সংক্রান্ত কিছু তথ্য জানাব। এরপর আমরা সাহিত্য গ্রন্থের যে প্রবন্ধগুলি আছে, সেগুলো ক্রমানুসারে পড়ে ফেলব। যতটা বেশি সম্ভব ততটাই পড়ব। মানে কোনটা পড়ব, কোনটা বাদ দেবো—সেরকম কিছু নয়। চেষ্টা করব সবটাই পড়ে ফেলতে এবং রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ভাবনার সাহিত্যতত্ত্ব সংক্রান্ত ভাবনার যে বিবর্তনের ধারা, সেটাও বোঝার চেষ্টা করব।

প্রথমেই বলি যে সাহিত্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৩১৪ বঙ্গাব্দে। রবীন্দ্রনাথ সেই সময়ে গদ্য গ্রন্থাবলী বলে পার্টে পার্টে, ভাগে ভাগে বেশ কিছু গ্রন্থ প্রকাশ করছিলেন। সেই যে গদ্য গ্রন্থাবলী, যে গদ্য গ্রন্থাবলীগুলো মজুমদার লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিত হতো, সেই গদ্য গ্রন্থাবলীর চতুর্থ ভাগ ‘সাহিত্য’ নামে প্রকাশিত হয়।

খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের প্রশ্ন জাগে মনে তাহলে যে গদ্য গ্রন্থাবলীর চতুর্থ ভাগ যদি সাহিত্য হয়…

বক্তা ৩ (শ্রোতা): স্যার, সাহিত্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় কত সালে? কাইন্ডলি একবার একটু বলবেন?

বক্তা ১: হ্যাঁ, আমি বলছি। আমি বলব, মানে মাঝে অনেকবার বলব। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন, আমি বলছি। মানে আসবেই এই প্রসঙ্গ ঘুরে ফিরে আসবে।

মজুমদার লাইব্রেরি থেকে পরপর যে গদ্য গ্রন্থাবলীগুলো প্রকাশিত হতে থাকে, সেই গদ্য গ্রন্থাবলীর চতুর্থ ভাগ যদি সাহিত্য হয়, তাহলে তার আগের ভাগগুলিতে অর্থাৎ প্রথম তিনটে ভাগ কবে প্রকাশিত হলো এবং কি প্রকাশিত হলো?

১৩১৪ বঙ্গাব্দে গদ্য গ্রন্থাবলীর চতুর্থ ভাগ হিসেবে ‘সাহিত্য’ গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধগুলো কিন্তু তার বহু আগে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আমরা যখন প্রবন্ধগুলি পড়ব, তখন সেই প্রবন্ধগুলি কখন কোথায় প্রকাশিত হয়েছে সেই বিষয়টা জেনে নেব। আপনারা নিজেরাও জেনে নিতে পারেন, এমন কিছু কঠিন নয়। সাহিত্য বই বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত সাহিত্য বইটি যদি আপনারা কেনেন, তার শেষেই গ্রন্থপরিচয় অংশে আপনারা দেখবেন দেওয়া আছে যে কোন প্রবন্ধটি কোন পত্রিকায় কত বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলো মানে প্রবন্ধ পড়ার সূত্রে তখন আমরা জানব।

আমরা প্রথমে এই বইটি যখন প্রকাশিত হচ্ছে, ‘সাহিত্য’ গ্রন্থ হিসেবে যখন প্রকাশিত হচ্ছে প্রথম ১৩১৪ বঙ্গাব্দে, তার আগে যে গদ্য গ্রন্থাবলীর তিনটে অংশ, সেইটার সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা আমরা নিতে চাই। মানে আমি দিতে চাই আপনাদের। তাহলে কোন ক্রমে বা কোন ধারায় সাহিত্য এলো, সেটা বুঝতে পারা সহজ হবে।

প্রথম গদ্য গ্রন্থাবলীর প্রথম ভাগ প্রকাশিত হয় ১৩১৪-র বৈশাখে। ১৩১৪ বঙ্গাব্দের বৈশাখে গদ্য গ্রন্থাবলীর প্রথম ভাগ প্রকাশিত হয়। মজুমদার লাইব্রেরি থেকেই প্রকাশিত হয়। এই যে গদ্য গ্রন্থাবলীর প্রথম ভাগ প্রকাশিত হয়, সেই গদ্য গ্রন্থাবলীর প্রথম ভাগের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’। এখন মজা হচ্ছে নাম দেওয়া হয়েছে ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’, কিন্তু সেখানে প্রবন্ধ ছাড়াও আরও অনেক কিছু আছে। এবং এই যে বিচিত্র প্রবন্ধ নাম দিয়ে গদ্য গ্রন্থাবলীর প্রথম ভাগ প্রকাশ হলো ১৩১৪ বঙ্গাব্দের বৈশাখে, আপনারা একটু যদি দেখেন সেখানে কি আছে, মানে কি কি প্রবন্ধ এবং কি কি গ্রন্থের প্রবন্ধ ওখানে আছে, তাহলে আপনারা দেখবেন সেখানে পঞ্চভূত আছে, য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারিও আছে। কিছু বন্ধুস্মৃতিও আছে এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে সেখানে রবীন্দ্রনাথের দুটো ছোটগল্পও প্রকাশিত হচ্ছে নাম দিচ্ছেন কিন্তু ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’। দুটি যে ছোটগল্প প্রকাশিত হচ্ছে, যে দুটি পরবর্তী ক্ষেত্রে ‘গল্পগুচ্ছ’-এ সংযোজিত হবে বা সংকলিত হবে গল্পগুচ্ছে, সেই গল্প দুটির মধ্যে একটি হচ্ছে ‘রাজপথের কথা’। এই গদ্য গ্রন্থাবলীতে সেটি ‘রাজপথ’ এই নাম নিয়ে সংকলিত হয়েছিল। মানে গদ্য গ্রন্থাবলীর প্রথম ভাগে, যেটা ওই বিচিত্র প্রবন্ধ নাম নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে ওই রাজপথের কথা ‘রাজপথ’ এই নামে প্রকাশিত হয়েছিল। আর অন্যটি যেটি প্রকাশিত হয়েছিল, সেটি হচ্ছে ‘অসম্ভব কথা’। এই দুটো রাজপথ অর্থাৎ রাজপথের কথা এবং অসম্ভব কথা—এই দুটো গল্প, যেটা পরবর্তী ক্ষেত্রে গল্পগুচ্ছে সংকলিত হবে, সেটাও কিন্তু এই বিচিত্র প্রবন্ধের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছিল।

যাইহোক, এই মানে প্রকাশের এই অদ্ভুত সংকলনের কারণে এটি আমার আপনাদের জানানোর ইচ্ছে জেগেছিল যে এখানে শুধুমাত্র প্রবন্ধ নয় এবং এই প্রবন্ধ গ্রন্থে কিছু মানে ক্ষুদ্র প্রবন্ধ যদি আমরা বলি সেগুলোও যেমন সংকলিত হয়েছে, তার সঙ্গে পঞ্চভূত গ্রন্থ পুরোটাই সংকলিত হয়েছে অর্থাৎ পঞ্চভূতের প্রবন্ধগুলো সংকলিত হয়েছে এবং য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারিও এতে সংকলিত হয়েছে। যাই হোক, এ হয়ে গেল গদ্য গ্রন্থাবলীর প্রথম ভাগ, যেটা ১৩১৪ বঙ্গাব্দের বৈশাখে প্রকাশিত হলো।

এবার গদ্য গ্রন্থাবলীর দ্বিতীয় ভাগ। গদ্য গ্রন্থাবলীর দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশিত হচ্ছে আষাঢ়ে। ১৩১৪ বঙ্গাব্দের ২৮শে আষাঢ়। এগুলো মানে এই তথ্যগুলো এবং এই প্রবন্ধের যে লিস্ট, এগুলো সবটাই আপনারা পেয়ে যাবেন প্রশান্তকুমার পালের ‘রবিজীবনী’র পঞ্চম খণ্ডে। আমি সেখান থেকেই সংগ্রহ করে আপনাদের জানাচ্ছি।

তো দ্বিতীয় যে ভাগটি গদ্য গ্রন্থাবলীর, সেটাও ১৩১৪ বঙ্গাব্দেই আষাঢ়ে প্রকাশিত হচ্ছে ২৮শে আষাঢ়, শনিবার। এখানে মূলত প্রকাশিত হলো ‘প্রাচীন সাহিত্য’ এবং এর নামও দেওয়া হলো ‘প্রাচীন সাহিত্য’। মানে গদ্য গ্রন্থাবলীর দ্বিতীয় ভাগ যেটি, সেই দ্বিতীয় ভাগকে এখানে নাম দেওয়া হয় প্রাচীন সাহিত্য। খুব স্বাভাবিকভাবেই বুঝতে পারছেন পরবর্তী ক্ষেত্রে আমরা যেটা মানে আলাদা করে প্রাচীন সাহিত্য গ্রন্থ বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত হয়ে পড়ি, সেই প্রাচীন সাহিত্যের সবটাই এখানে সংকলিত হয়েছিল অর্থাৎ গদ্য গ্রন্থাবলীর দ্বিতীয় ভাগ প্রাচীন সাহিত্য। সময়টাও পরিষ্কার আমাদের কাছে—১৩১৪ বঙ্গাব্দের ২৮শে আষাঢ়।

এরপর গদ্য গ্রন্থাবলীর তৃতীয় ভাগ প্রকাশিত হলো। সেটি প্রকাশিত হলো ১৩১৪ বঙ্গাব্দের ১০ই শ্রাবণ। এই তৃতীয় ভাগ প্রকাশিত হলো ‘লোকসাহিত্য’ নামে। এটাও আমাদের কাছে স্পষ্ট যে পরবর্তী ক্ষেত্রে লোকসাহিত্য বলে যে বইটি পড়ি, সেটাও প্রথম প্রকাশিত হচ্ছে গদ্য গ্রন্থাবলীর তৃতীয় ভাগ এই হিসেবে। সব কটাই কিন্তু মজুমদার লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিত। লক্ষ্য করে দেখুন, একই সনে বিভিন্ন মাসে পরপর প্রকাশিত হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ চাইছেন এগুলো পরপর প্রকাশিত হোক। এই সময়ের মানে এইগুলো প্রকাশিত হলে কিছু অর্থনৈতিক সুরাহা হবে, সেই ভাবনাগুলোও ছিল। সেটা আমরা পাব মানে সেই ভাবনাটা আমরা বুঝতে পারব যে অর্থনৈতিক ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কিছু ভাবনা এই সময় ছিল। তাড়াতাড়ি প্রকাশিত হয়ে গেলে কিছু যদি অর্থপ্রাপ্তি হয়, তাহলে সেটা বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যয় করা যাবে। হয়তো সেই কারণেই এই দ্রুততা। মানে পরপর প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে। আষাঢ়ের পর শ্রাবণেই গদ্য গ্রন্থাবলীর তৃতীয় ভাগ প্রকাশিত হয়ে গেল লোকসাহিত্য নামে। লোকসাহিত্যের যে প্রবন্ধগুলো মোটামুটিভাবে সবই এখানে আছে। আমরা যেগুলো পরবর্তী ক্ষেত্রে লোকসাহিত্যে পাই, মানে লোকসাহিত্য গ্রন্থে পাই, সেগুলো মানে সেগুলো এখানে প্রকাশিত হয়েছিল। কিছু সংযোজন তো পরবর্তী ক্ষেত্রে হয়েইছে, সেটা অন্য প্রসঙ্গ।

এরপর এই চতুর্থ ভাগ, যেটা নিয়ে আমাদের কারবার। এই চতুর্থ ভাগ গদ্য গ্রন্থাবলী প্রকাশিত হলো আমি বললাম ১৩১৪ বঙ্গাব্দে। কিন্তু কোন মাস সেটা নিয়ে একটু সমস্যা আছে। মানে সমস্যা আছে ইন দ্য সেন্স বা এই অর্থে যে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আপনারা একটু লক্ষ্য করলে দেখবেন যে সাহিত্য গ্রন্থের বিশ্বভারতী সংস্করণ পাওয়া যায় বাজারে, সেখানে কিন্তু এই পুলিনবিহারী সেন সম্পাদিত ১৩১৪ বঙ্গাব্দেই আছে। মানে পুলিনবিহারী সেন কর্তৃক প্রকাশিত ১৩১৪ বঙ্গাব্দেই আছে। কিন্তু ১৩১৪ বঙ্গাব্দের কোন মাস আমি দেখিনি। আমরা অনুমান করতে পারি কোন সময়ে এটা প্রকাশিত হয়েছিল। সেই অনুমানের ভিত্তিটা রবীন্দ্রনাথের কিছু চিঠি, শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে লেখা চিঠি। তো সেই চিঠিগুলো আমরা একটু পড়ে ফেলি। তাহলে দেখতে পারব বা বুঝতে পারব ঠিক কোন মাসে, মানে ১৩১৪ বঙ্গাব্দের শ্রাবণের পর ঠিক কোন মাসে এটা প্রকাশিত হয়েছিল বা হতে পারে, তার একটা অনুমান আমাদের সামনে উঠে আসবে। সেই অনুমান প্রমাণের ক্ষেত্রে এই দুটো চিঠি শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে লেখা আমাদের কাজে লাগবে।

আসছি মানে পড়ছি সেই চিঠি দুটো। তার আগে একটা কথা বলি যে এই যে মানে চতুর্থ ভাগ যেটা গদ্য গ্রন্থাবলীর ‘সাহিত্য’ নাম দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে, সেটা প্রশান্ত পালের যে রবিজীবনী, সেখানেও দেখবেন ঠিকঠাক করে কোন মাসে প্রকাশিত হয়েছে সেইটা বলা হচ্ছে না। অনুমান করা হচ্ছে, সেখানেও অনুমান করা হচ্ছে যে কোন মাসে প্রকাশিত হয়েছে। আগে আমি প্রশান্ত পালের অনুমানের জায়গাটা আপনাদের পড়ে দিচ্ছি। মানে তিনি কি অনুমান করছেন সেই অংশটা উদ্ধৃত করছি। তারপর আমি ওই চিঠি দুটোকে ধরে আমাদের অনুমানের জায়গাটাকে বোঝার চেষ্টা করব। সেটা যে প্রশান্ত পালের সঙ্গে খুব বিরোধের হবে এমনটা নয়। কিন্তু আমরা বোঝার চেষ্টা করব যে প্রশান্ত পাল কিভাবে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাতে চেয়েছেন এবং আমরা কিভাবে ভাবতে চাইছি। প্রশান্ত পাল বলছেন এইরকম, মানে উদ্ধৃত করছি আমি, কোট আনকোট:

১৯শে ভাদ্র (বৃহস্পতিবার, ৫ই সেপ্টেম্বর) রবীন্দ্রনাথ শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে অনুযোগ জানিয়ে লিখেছিলেন আজও—উদ্ধৃতির মধ্যে, চিঠির অংশ—‘আজও সাহিত্য বইখানা বাহির কেন হইল না? শৈলেশকে জিজ্ঞাসা করিয়া আমাকে খবর দিও।’

তাহলে লক্ষ্য করে দেখুন, ১৯শে ভাদ্র চিঠি লিখছেন ১৩১৪ বঙ্গাব্দের, তখনো পর্যন্ত সাহিত্য গ্রন্থটা প্রকাশিত হয়নি এবং রবীন্দ্রনাথের তাড়া আছে। মানে তিনি বিরক্তও হয়েছেন যে আমি নয়, তুমি তোমার মানে লোকজনকে জিজ্ঞাসা করো যে শৈলেশকে জিজ্ঞাসা করো যে কেন সাহিত্য বইখানা এখনো বার হয়নি, এখনো কেন প্রকাশিত হয়নি। সমস্ত কাজ তো মানে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা, তাহলে প্রকাশ হতে এত কেন দেরি হচ্ছে? এটা বলছেন।

বলার পর মানে প্রশান্ত পাল জানাচ্ছেন এরকম যে এই ঘটনাটা ১৯শে ভাদ্র ঘটে গেল। ঘটে যাবার পর ২৫শে ভাদ্র, বুধবার, ১১ই সেপ্টেম্বর তিনি বলছেন এটাই যে মানে তিনি ওই হিসেবের খাতা থেকে পাচ্ছেন এরকম একটা তথ্য—‘মজুমদার লাইব্রেরি হইতে গদ্য গ্রন্থাবলী চতুর্থ ভাগ ৩০০ আনার মোটে ভাড়া হিসেবে’ হিসাব থেকে জানা যায় সাহিত্য প্রকাশিত হয়ে গেছে। তাহলে জানতে পারছি সাহিত্য প্রকাশিত হয়ে গেছে কবে? ওই গদ্য গ্রন্থাবলীর চতুর্থ ভাগ মানে ৩০০ টা নিয়ে আসছেন এবং তার কিছুটা মুটে ভাড়া খরচ হয়েছে ওই গ্রন্থগুলো নিয়ে আসার জন্য, ৩০০ খানা বই নিয়ে আসার জন্য। সেই তথ্যটা পাচ্ছি ২৫শে ভাদ্র। তার মানে ১৯শে ভাদ্র থেকে ২৫শে ভাদ্রের মধ্যে কোনো একটা সময়ে এই গদ্য গ্রন্থাবলী প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এক্সাক্ট মানে এই ভাদ্র মাসের ঠিক কোন সময়ে, মানে আমরা অনুমান করতে পারি তাহলে শ্রাবণ মাসে যদি গদ্য গ্রন্থাবলীর তৃতীয় ভাগ লোকসাহিত্য নাম নিয়ে প্রকাশিত হয়, তাহলে গদ্য গ্রন্থাবলীর চতুর্থ ভাগ ভাদ্র মাসে প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু লক্ষ্য করে দেখুন, আমি আপনাদের ওই দ্বিতীয় ভাগ এবং তৃতীয় ভাগের ডেট পর্যন্ত বলে দিতে পারলাম প্রশান্ত পাল থেকেই যে ২৮শে আষাঢ় এবং ১০ই শ্রাবণ।

বক্তা ৪ (শ্রোত্রী): স্যার, আপনার কথা কেটে কেটে আসছে।

বক্তা ১: চতুর্থ ভাগ সাহিত্য সেটার প্রকাশের সময় ঠিক ডেটটা কত, সেটা এভাবে নির্দিষ্ট করা যাচ্ছে না কিন্তু বোঝা যাচ্ছে…

বক্তা ৫ (শ্রোতা): স্যার, আগের দুটো বাক্য কেটে গেছে।

বক্তা ১: কেটে আসছে?

বক্তা ৫: হ্যাঁ।

বক্তা ১: এই রে! মানে মুশকিল হচ্ছে রিপিট কি করে করি? সকলের ক্ষেত্রে এরকম হচ্ছে? তাহলে আমি কি একবার লেফট হয়ে ঢুকবো? মানে নেটের সমস্যা হচ্ছে?

বক্তা ৪: না না স্যার, না না।

বক্তা ৬ (শ্রোত্রী): না না, এখন খুব ভালো শোনা যাচ্ছে।

বক্তা ৪: হ্যাঁ দুটো শোনা যায়নি। ওই ১৯শে ভাদ্র থেকে ২৫শে ভাদ্রের কথা বললেন না? ওই জায়গাটা আরেকবার একটু বলুন।

বক্তা ১: আচ্ছা, আমি বলতে চাইছি এটাই যে এই গদ্য গ্রন্থাবলীর চতুর্থ ভাগ আমরা অনুমান করতে পারছি ১৯শে ভাদ্র থেকে ২৫শে ভাদ্রের মধ্যে কোনো একটা সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু আগের যে গদ্য গ্রন্থাবলীর দুটো ভাগ, অর্থাৎ দ্বিতীয় ভাগ আর তৃতীয় ভাগে এক্সাক্ট ডেটটা বলে দেওয়া যাচ্ছে—প্রশান্ত পাল থেকেই বলতে পারছি—২৮শে আষাঢ় এবং ১০ই শ্রাবণ, সেটা এই চতুর্থ ভাগের ক্ষেত্রে বলা যাচ্ছে না। ফলত আমরা অনুমান করতে পারি ১৯শে ভাদ্র থেকে—১৯শে ভাদ্র যে প্রকাশিত হয়নি সেটা স্পষ্ট—কিন্তু তারপর অর্থাৎ ওই ২০শে ভাদ্র থেকে ২৫শে ভাদ্রের মধ্যে কোনো একটা সময়ে এই গদ্য গ্রন্থাবলী প্রকাশিত হয়েছে, এমনটা আমরা অনুমান করতে পারি। তাহলে আমরা খুব সরলভাবে বলতে পারি যে গদ্য গ্রন্থাবলীর চতুর্থ ভাগ, যেটা ‘সাহিত্য’ নাম, সেই সাহিত্য গ্রন্থটি ১৩১৪ বঙ্গাব্দের ভাদ্রে প্রকাশিত হয়েছে। খুব মানে সরলভাবে এটাকে বলতে পারি। এটা স্পষ্ট আপনাদের কাছে?

বক্তা ৪ ও অন্যান্য: হ্যাঁ স্যার। হ্যাঁ স্যার।

বক্তা ১: বেশ। বেশ, তাহলে প্রকাশ সংক্রান্ত তথ্য আমরা মানে ‘সাহিত্য’ গ্রন্থটি কখন প্রথম প্রকাশিত হয় সেই সংক্রান্ত তথ্য আমাদের কাছে স্পষ্ট প্রশান্ত পালকে ধরে।

এবার আমি বলেছিলাম যে দুটো চিঠির কথা, যে দুটো চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ এই সাহিত্য গ্রন্থের বিষয়ে উল্লেখ করছেন। যেহেতু সাহিত্য গ্রন্থের সঙ্গে রিলেটেড, সেই চিঠি দুটো আমরা একটু দেখে নেব যে কি বলতে চাইছেন রবীন্দ্রনাথ, তার বক্তব্যটা কি। শ্রীশচন্দ্র… দুটো চিঠি শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে লেখা। শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে লেখা প্রথম যে চিঠিটির আমি উল্লেখ করতে চাই, সেটি পহেলা শ্রাবণ ১৩১৪ বঙ্গাব্দে লেখা। সেখানে তিনি লিখছেন এইরকম—শ্রীশচন্দ্রকে রীতিমত অনুযোগ জানাচ্ছেন। মানে একটু আগে যে অনুযোগের কথা আছে বলে আমাদের মনে হলো যে রবীন্দ্রনাথ ওই ১৯শে ভাদ্রের যে চিঠি, মানে এটা পরের চিঠি, আমি তার আগের একটা চিঠি বলতে চাইছি। ১৯শে ভাদ্রের যে চিঠি, যে চিঠিতে ‘তুমি নিজে শৈলেশকে জিজ্ঞাসা করো করে আমাকে খবর দিও কেন সাহিত্য এখনো ছাপা হলো না’, ঠিক সেই বক্তব্যের আগে যে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যটা ছিল সেইটা আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাইছি।

তাহলে আমি বলতে চাইলাম যে এই চিঠির মানে দিন হচ্ছে পহেলা শ্রাবণ ১৩১৪ বঙ্গাব্দের। কি বলছেন তিনি শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে?

‘তোমার ভাইয়ের হাত হইতে আমাকে উদ্ধার করো।’

আক্ষেপটা দেখুন কোন পর্যায়ে আছে! আধুনিক পরিভাষায় বলি কোন লেভেলে আছে! মানে যে আক্ষেপটা প্রশান্ত পাল উল্লেখ করে যেটুকু দেখাতে চেয়েছেন, তার থেকে যে আরও বেশি আক্ষেপ ওই ভাদ্রের আগে শ্রাবণে ছিল সেটা স্পষ্ট।

‘তোমার ভাইয়ের হাত হইতে আমাকে উদ্ধার করো। মনে করিয়াছিলাম পূজার পূর্বে গদ্য গ্রন্থাবলীর অন্তত সাহিত্য প্রবন্ধ পর্যায় ছাপা শেষ হইয়া যাইবে। তাহা হইলে পূজা উপলক্ষে হয়তো গুটাকতক বই বিক্রি হইতে পারিবে।’

তাহলে বই বিক্রির চিন্তা রবীন্দ্রনাথের আছে। এইটা আমি বলতে চাইছিলাম আপনাদের, যে পরপর পরপর বইগুলো প্রকাশিত হচ্ছে—গদ্য গ্রন্থাবলী এক, দুই, মানে প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ, তৃতীয় ভাগ, চতুর্থ ভাগ পরপর কয়েক মাসের মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে। দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ পর্যন্ত তো মানে এক মাসের ব্যবধানে প্রায় প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে। তাহলে কোথাও না কোথাও ওই বিক্রির চিন্তা রবীন্দ্রনাথের আছে, অর্থনৈতিক ভাবনা আছে। তো সেই কারণে ওই ‘ভাইয়ের হাত থেকে উদ্ধার করো’ এইরকম ভাবনাটা তার চলে এসেছে।

‘কিন্তু সাতদিন অন্তর এক ফর্মা করিয়া প্রুফ পাইলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। এমন করিয়া পাঁচ-ছয় বৎসরেও আমার বই ছাপা শেষ হইবে না।’

মানে এত স্লো কাজ হচ্ছে, সেটাতে রবীন্দ্রনাথ যথেষ্ট বিরক্ত। যে সাতদিন অন্তর যদি এক ফর্মা প্রুফ পাই, তাহলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। আমি প্রুফ কারেকশন করে পাঠিয়ে দিতে পারব। কিন্তু যে গতিতে কাজ চলছে, তাতে পাঁচ-ছয় বছরে আমার বই ছাপা শেষ হবে না।

‘ওদিকে এই সকল কারণেই আমি যোগীন সরকারের সঙ্গে এই গ্রন্থাবলী প্রকাশের কথা প্রায় পাকা করিয়াছিলাম।’

তার মানে অন্য কোন প্রকাশক—যোগীন সরকার মানে যিনি সেই অন্য প্রকাশকের কর্ণধার, তার সঙ্গে এই গ্রন্থাবলী প্রকাশের কথা পাকা করে ফেলেছিলেন। কেন? এই মজুমদার লাইব্রেরি কথা দিয়ে কথা রাখছে না, পয়সাকড়ির হিসেব ঠিকঠাকভাবে হচ্ছে না, যার জন্য সমস্যা হচ্ছে।

পরবর্তী অংশে যাই, তাহলে বুঝি আক্ষেপটা কোন জায়গায় আরও আছে।

‘ইতিমধ্যে পুনশ্চ আমার দুর্ভাগ্য ও দুর্বুদ্ধিক্রমে শৈলেশের পরামর্শ শুনিয়া শিলাইদহে আসিবার পূর্বে যোগীন সরকারকে জবাব দিয়া পত্র লিখিয়াছি।’

তাহলে ওই এই সেই শৈলেশের উল্লেখ এখানে আমরা পাচ্ছি, যে শৈলেশের কারণে তিনি এই মজুমদার লাইব্রেরিতে এসে এই গদ্য গ্রন্থাবলী ছাপতে দিয়েছেন। তাই শৈলেশের পরামর্শই মানে সেই পরামর্শটা নেওয়া আমার দুর্বুদ্ধি ছিল, কেন আমি নিয়ে ফেলেছিলাম। আমি না নিলেই ভালো করতাম। আমি যদি যোগীন সরকারের কথাতে রাজি হয়ে যেতাম, তাহলে এই বিপত্তিটা পাকতো না। আজ আমি ওই শৈলেশের পরামর্শে যোগীন সরকারকে না করে দিয়েছি, মানে জবাব দিয়া পত্র লিখেছি অর্থাৎ না করে দিয়েছি। সেই কারণে আমার আজকের এই সমস্যাটা হচ্ছে।

‘ছাপাখানার দেনা আমি ক্রমে ক্রমে শোধ করিয়া চলিব বলিয়া স্থির করিয়াছিলাম। হিসাব না পাইয়া কিছুই করিতে পারিতেছি না। আমি তাহাকে এতবার এতরকম শাসাইয়া পত্র লিখিয়াছি যে সে আমার শাসন বাক্যকে আর ভয়ই করে না।’

মানে বেশি শাসন হয়ে গিয়েছে। মানে আর কত ভাবে বলব? যত রকম শাসন করা যায় করেছি, এখন আর আমাকে ভয়ই পায় না।

‘শাসন বাক্যকে আর ভয়ই করে না। জানে আমি কেবল গর্জনই করি। যাহাই হউক এস্থলে আমি কি করিব, তুমি আমাকে পরামর্শ দিও।’

আমি আর পড়ছি না এরপরে। কেননা এই অংশটুকুর মধ্যেই এই গদ্য গ্রন্থাবলীর চতুর্থ ভাগ অর্থাৎ যেটা আমরা সাহিত্য গ্রন্থ হিসেবে পড়ছি, সেটা নিয়ে যে রবীন্দ্রনাথের একটা অশান্তি আছে এবং এই মজুমদার লাইব্রেরির সঙ্গেই যে একটা টানাপোড়েন আছে, সেই ভাবটুকু পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। এটা গেল শ্রাবণে, পহেলা শ্রাবণে লেখা চিঠি।

এরপর প্রশান্ত পাল যে চিঠিটার উল্লেখ করছেন, সেই চিঠিটার অংশও আমি আপনাদের পড়ে শোনাচ্ছি। সেটা এত কথা নেই, অল্প কথা আছে সেখানে। হয়তো মাঝখানে কাজ অনেক এগিয়েছে, যার জন্য রবীন্দ্রনাথ কিছুটা আশাবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও ছাপা যে হচ্ছে না, মানে তৃতীয় ভাগ প্রকাশের পর অনেকটা সময় কেটে গিয়েছে, সেইটার জন্য শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে তিনি কিছু বলছেন। এই চিঠিটা ১৩১৪ বঙ্গাব্দের ১৯শে ভাদ্র প্রশান্ত পাল যেটা উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি বলছেন এই রকমই যে, আমি শুরু থেকেই পড়ছি ছোট্ট চিঠি:

‘চিঠি পড়িয়া দেখিও। তোমরা কোনোমতেই ব্যবস্থা করিতে পারিবে না অথচ কাগজ রাখিতেই হইবে এ গ্রহ কেন? কত লোকের কাছ হইতে যে নালিশ আসে তাহার ঠিকানা নেই, ঠিকানা নাই। আজও সাহিত্য বইখানা বাহির কেন হইল না? শৈলেশকে জিজ্ঞাসা করিয়া আমাকে খবর দিও।’

এই অংশটুকুই প্রশান্ত পাল উল্লেখ করছেন। এরপর মানে মীরা, কন্যা মীরাকে ডাক্তার দেখানোর কথা, মীরা দেবী ভালো আছেন আগের তুলনায় একটু, একটু জ্বরের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে—এ সমস্ত বলছেন। এবং বোলপুরে এসে যাতে কাটিয়ে যান, সেই প্রসঙ্গেও কথা বলছেন।

যাইহোক না কেন, আমার বক্তব্য এটাই যে এই গ্রন্থটা প্রকাশ নিয়ে অর্থাৎ এই চতুর্থ ভাগ গদ্য গ্রন্থাবলীর, যেটা সাহিত্য নাম নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথের একটা ছোটখাট অশান্তির সময় কেটেছে। ওই শ্রাবণ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত, পহেলা শ্রাবণের চিঠি থেকে আমরা ১৯শে ভাদ্রের চিঠি পর্যন্ত এই সময়কালটাকে যদি দেখি, তাহলে বুঝতে পারছি যে এই সাহিত্য গ্রন্থটা নিয়ে প্রকাশকের সঙ্গে একটা টানাপোড়েন হয়েছে।

শুধু গল্প জানার জন্যই এটা জানা হলো। প্রকাশ সংক্রান্ত তথ্য জানব বলেই আমরা জানলাম। এবার এই যে সাহিত্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হলো, এই সাহিত্য গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ তার যে বিভিন্ন প্রবন্ধগুলো আছে, সেগুলো কালানুক্রমিক সাজাননি। রবীন্দ্রনাথ যেভাবে বিষয়কে ভেবেছেন, সেই বিষয়ানুক্রমিক সাজিয়েছেন। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের বিষয় ভাবনা অনুযায়ী এই সাহিত্য গ্রন্থের প্রবন্ধগুলো পরপর তিনি রেখেছেন।

আপনারা একটু লক্ষ্য করলে দেখবেন, আমরা মানে আজ নয় মানে অত তথ্য একদিনে নয়, তো আগামী ক্লাসেই সেটা দেখব। একটু লক্ষ্য করবেন যে প্রায় ১২০০… মানে এখন যে সাহিত্য গ্রন্থটা আমরা পড়ি, সেটার সঙ্গে এই গদ্য গ্রন্থাবলীর সাহিত্য গ্রন্থের কিছু তফাত আছে। তফাত এই সূত্রেই যে বেশ কিছু প্রবন্ধ প্রথমে ছিল না। অর্থাৎ ১৩১৪ বঙ্গাব্দের ভাদ্রে যে সাহিত্য গ্রন্থটি গদ্য গ্রন্থাবলীর চতুর্থ ভাগ অর্থাৎ যে ওই সাহিত্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়, সেই সাহিত্য গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ যে কটা প্রবন্ধ রেখেছিলেন, তারপর কিন্তু যখন তিনি রবীন্দ্র রচনাবলী প্রকাশ করলেন, তার সঙ্গে আরও নটি প্রবন্ধ যুক্ত করেন। এরপর বিশ্বভারতীর ১৩৬১-তে যে সংস্করণ প্রকাশিত হয়, সেখানে আরও কিছু প্রবন্ধ যুক্ত হয়। এরপর আমরা যে সাহিত্য গ্রন্থটি এখন হাতে পাই, তাতে আরও তিনটি সংযুক্ত হয়। ফলত এখানে কালে কালে পরিবর্তন হয়েছে। এই বিভিন্ন সময়ে এই গদ্য গ্রন্থ মানে এই প্রবন্ধগুলো আরও সংযোজিত হয়েছে। ফলত আমরা যখন মানে আরও বিস্তারে যাব, তখন আমি বলেই মানে আমিও বলব, সেটা আপনারা নিজেরাও পাবেন বা পেয়েছেন, আমি বলছি নতুন এমনটি নয়। মানে সামান্য তথ্যমাত্র এগুলো।

যে এই যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানে প্রবন্ধগুলো সংযোজিত হয়েছে, সেই সংযোজনের জায়গাগুলো আপনারা দেখেন, তাহলে একটু লক্ষ্য করবেন এটাই যে মানে মানে মজাটা এটাই যে রবীন্দ্রনাথ যে প্রবন্ধগুলো লিখছেন প্রায় ১২৯৩ বঙ্গাব্দে, ১২৯৯ বঙ্গাব্দে, ১২৯৪ বঙ্গাব্দে—সেগুলো সংযোজিত হচ্ছে। আর শুরুতেই যে প্রবন্ধটি আছে ‘সাহিত্যের তাৎপর্য’, সেটি কিন্তু অনেক পরে লেখা। তাহলে এটাতেই আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারছি যে রবীন্দ্রনাথ এখানে কালানুক্রমিক প্রবন্ধগুলো রাখেননি। আমি বাদ দিচ্ছি যে পরে যেগুলো সংযোজন হয়েছে সেটাকে যদি বাদও দিই, তাহলেও প্রথম যে প্রবন্ধগুলো তিনি সংযোজন করেছিলেন সাহিত্য গ্রন্থে, গদ্য গ্রন্থাবলীর চতুর্থ ভাগে, সেখানে ‘সাহিত্যের তাৎপর্য’ থেকে ‘কবিজীবনী’ পর্যন্ত এই কটা প্রবন্ধ ছিল। সেখানেও আগে পরে হয়েছে। সেখানেও প্রবন্ধগুলো কোনটা আগে প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়, কোনটা পরে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ সেই সময়ক্রমকে রক্ষা করেননি। সেই সময়ক্রমকে রক্ষা না করে তিনি তাঁর মতো মানে মনে হয়েছে এইভাবে বিষয়ক্রমকে রাখলে পাঠকের বুঝতে সুবিধা হবে, যে সাহিত্যতত্ত্ব তিনি আমাদের সামনে উপস্থাপন করতে চাইছেন বুঝতে সুবিধা হবে, সেটা ভেবে তিনি তাঁর মতো সাজিয়েছেন।

এখন এই ক্রম আমরা মানবো, নাকি যে কালানুক্রমে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন সেইভাবে পড়ব—সেটা আমরা পড়ার সময় বুঝে নেব। যে ক্রম ভেঙে আমরা ওই কালের ক্রমে পড়ব নাকি রবীন্দ্রনাথ বিষয়ের ক্রমে যেভাবে রেখেছেন, তাঁর চিন্তনের ক্রমে যেভাবে রেখেছেন যে এইভাবে ভাবলে বোধহয় সুবিধা হয়, এইভাবে ভাবলে বোধহয় পাঠকরা সাহিত্যতত্ত্বের বিষয়গুলো ঠিকভাবে বুঝতে পারবেন, সেই ক্রমে রাখব—সেটা একটা আলোচনার বিষয় বা ভাববার বিষয় আমাদের কাছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা আমাদের সাহিত্য গ্রন্থটি পড়ার চেষ্টা করব। এটা একটা ভাবনা, মানে এই প্রবন্ধের ক্রম অনুসারে পড়ার জায়গাটা।

দ্বিতীয় ভাবনা যেটা, সেটা হচ্ছে যে রবীন্দ্রনাথের আগেও তো আমাদের ভারতবর্ষে যেটাকে আমরা বলি মানে ভারতীয় কাব্যতত্ত্ব, অর্থাৎ কিভাবে সাহিত্য নির্মিত হবে এবং সেই নির্মিত সাহিত্য ভোক্তা কিভাবে ভোগ করবেন, তার কিছু তত্ত্ব বা সূত্র ছিল। তার কিছু ব্যাকরণ আমাদের কাছে ছিল, তার কিছু নিয়ম আমাদের কাছে ছিল। সেই যে প্রাচীন সংস্কৃত আলংকারিকদের নিয়ম, আমি এখানে আলংকারিক শব্দটি শুধুমাত্র রেটরিক অর্থে ব্যবহার করছি না। অর্থাৎ অলংকার বলতে শুধুমাত্র ওই অনুপ্রাস, যমক, রূপক, শব্দালঙ্কার, অর্থালঙ্কার যে বিভাজনগুলো সেই অর্থে ব্যবহার করছি না। আমি এখানে সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্রে অলংকার শব্দটি এসথেটিক অর্থে ব্যবহৃত হয় অর্থাৎ নন্দনতত্ত্ব অর্থে ব্যবহৃত হয়, বাংলা যদি করি। তাহলে সেই নান্দনিক তাত্ত্বিক অর্থেই অলংকার শব্দটি প্রয়োগ করছি। তাহলে এই যে আমাদের অলংকার শাস্ত্র ছিল, যার মধ্যে আপনারা অনেকেই হয়তো পড়েছেন রীতিবাদ আছে, ধ্বনিবাদ আছে, রসপ্রস্থান আছে, বিভিন্ন রকমের যে বিভাগগুলো আছে—ধ্বনিবাদ আছে, এই যে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কাব্যকে বোঝার চেষ্টা, এই ঐতিহ্য রবীন্দ্রনাথ কতটা নিচ্ছেন অথবা নিচ্ছেন না? অথবা একথা আমরা সকলেই আজ মানি যে রবীন্দ্রনাথ আসলে রোম্যান্টিক গীতিকবি। তাহলে এই রোম্যান্টিক গীতিকবির যে ভাবনা, সেটা কতদূর পর্যন্ত তাঁর সাহিত্য ভাবনাকে প্রভাবিত করছে, সেই জায়গাগুলো আমরা ভাবার চেষ্টা করব।

এই পুরোটাকে যদি আমরা একটা ক্ষুদ্র ভাবনায় আনি, তাহলে দাঁড়ায় এটাই যে যে কোন সাহিত্য ভাবনায় অর্থাৎ আমাদের প্রাচীন আলংকারিক সাহিত্যতত্ত্বে হোক বা রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যতত্ত্বে হোক, যাই হোক না কেন, এই সমস্ত কিছুর মধ্যে তিনটে অংশ আছে। এই তিনটে অংশ আপনাদের আগে প্রথমে বুঝে নিতে হবে। রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর সাহিত্য গ্রন্থে সাহিত্যতত্ত্বের কথা বলবেন, তখন এই তিনটে অংশ নিয়েই কথা বলবেন। তিনটে অংশের মধ্যে:

একজন আছেন কবি, অর্থাৎ স্রষ্টা—আমরা এইভাবে ভাবি। শুধু কবি নয়, স্রষ্টা। শিল্প সৃষ্টি করতে পারেন যিনি, সেই স্রষ্টা।

  • দ্বিতীয় জন আছেন যিনি ভোক্তা। অর্থাৎ এই সৃষ্টিকে যিনি উপভোগ করেন বা ভোগ করেন। অর্থাৎ পড়েন, শোনেন, দেখেন—এই অর্থে দর্শক হতে পারে, এই অর্থে পাঠক হতে পারে, এই অর্থে শ্রোতা হতে পারে। এই সবটাকে মিলিয়ে আমরা ওই সংস্কৃত আলংকারিকদের একটাই শব্দ ব্যবহার করছি নিয়ে এসে সেখান থেকে—ভোক্তা। তাহলে দ্বিতীয় অংশ যে মানে যিনি আছেন, তিনি হচ্ছেন ভোক্তা। তাহলে একটা স্রষ্টা, দ্বিতীয় ভোক্তা।

  • এই দুজনের মাঝে সংযোগ সাধন করছেন সৃষ্টি। এই যে সৃষ্টি, সেটা স্রষ্টার দ্বারা নির্মিত।

তাহলে এই তিনটে অংশ আমাদেরকে আগে স্পষ্ট বুঝে নিতে হবে। যে যখনই সাহিত্যতত্ত্বের আলোচনা হবে, তখনই স্রষ্টার কথা আসবে। স্রষ্টা কিভাবে সৃষ্টি করেছেন বা করতে পারেন, কোন গুণে তিনি সৃষ্টিটা করতে পারেন সেটা আসবে। এবং ওই সৃষ্টিটা আমরা যে উপভোগ করছি অর্থাৎ ভোক্তা আমাদের কাছে আসছে, আমরা এবার সেটাকে কোন মানদণ্ডে তাকে উপভোগ করব? শুধু ভালো লাগছে, আমার পড়তে ভালো লেগে আনন্দ হচ্ছে—সাহিত্যতত্ত্ব ঠিক একথা বলে না। না প্রাচ্য সাহিত্যতত্ত্ব, না পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব।

আপনি রোম্যান্টিসিজম যখন বুঝবেন, আপনি ক্লাসিকালিজম যখন বুঝবেন, আপনি যখন রিয়ালিজম বুঝবেন বা সেসব কিছুকে ছাড়িয়ে সুররিয়ালিজম, ম্যাজিক রিয়ালিজমে চলে যাবেন—সবটার ক্ষেত্রে একটা নির্দিষ্ট মানদণ্ড আছে। যে এই এই গুণাবলীগুলো এর মধ্যে আছে। এমনকি আপনি যখন সাহিত্য সমালোচনার পাশ্চাত্যের বিভিন্ন রীতিগুলোকে অনুসরণ করবেন—ঐতিহাসিক সাহিত্য সমালোচনা পদ্ধতি হতে পারে অথবা মার্ক্সীয় সাহিত্য সমালোচনা পদ্ধতি হতে পারে অথবা আর্কেটাইপাল সাহিত্য সমালোচনা পদ্ধতি হতে পারে—যেকোনো সাহিত্য সমালোচনা পদ্ধতির একটা নির্দিষ্ট মানদণ্ড আছে। সেটা শুধু আমার আবেগে ভালো লাগছে, আমার পড়ে ভালো লেগেছে, এই চরিত্রটা এরকম হলে ভালো হতো, এর সঙ্গে আমি অনেক মানসিক সামীপ্য অনুভব করছি তাই এটা এরকম—হ্যাঁ এটা একটা ভাবনা হতে পারে কিন্তু সেটা একটা অংশমাত্র, সেটা সব নয়। সামান্য একটা অংশমাত্র। তার বাইরে কিছু নির্দিষ্ট রীতি পদ্ধতি আছে।

এই যে নির্দিষ্ট রীতি পদ্ধতিগুলো, সেই রীতি পদ্ধতিগুলো রবীন্দ্রনাথের এই গ্রন্থে কতটা অনুসৃত হয়েছে বা রবীন্দ্রনাথ তাঁর মতো কি রীতি পদ্ধতি তৈরি করতে চাইছেন, কিন্তু যেটাই তৈরি করতে চান না কেন, মূল ভাবনা এই তিনটে অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে—স্রষ্টা, সৃষ্টি এবং ভোক্তা।

একটু লক্ষ্য করলে দেখুন যে এই যে স্রষ্টা, সৃষ্টি আর ভোক্তা বলছি, রবীন্দ্রনাথও বলবেন এই কথা। স্রষ্টা বাইরের জগতকে দেখেন। আপনি যদি ভরতের নাট্যশাস্ত্র দেখবেন, তাহলে দেখেন তাহলে লক্ষ্য করবেন ভরত বলছেন নাটক কি? না, নাটক ‘লোকবৃত্তানুকারণং’। নাটক লোকবৃত্তির অনুকরণ। অর্থাৎ আমার চারপাশের যে বাস্তব জগত আছে, সেই বাস্তব জগতের এক প্রকার অনুকরণ ক্রিয়া। সেই অনুকরণ… হ্যাঁ, মানে এবার অনুকরণ কাকে বলব কি, সে তো তত্ত্বের কথা। নিশ্চয়ই আসব, রবীন্দ্রনাথও অনুকরণ নিয়ে কথা বলবেন। তিনিও বলবেন সাহিত্য প্রকৃতির আরশিনা নহে। অ্যারিস্টটলও মাইমেসিসের কথা বলেছেন। এবার এইগুলো কিভাবে এসেছে সেই জায়গাটার কথা আমরা বলব।

কিন্তু মানে প্রাথমিক যদি এই ভাবনাটা ভাবি যে স্রষ্টা এই জগতে যা দেখছেন, তিনি তাঁর মনের মাধুরী মিশিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় নিজত্ব থেকে মানবত্বে যাচ্ছে। স্রষ্টার মনের দুটো অংশ—নিজত্ব আছে এবং মানবত্ব আছে। সৃষ্টিকর্তা নিজত্ব নয়, সৃষ্টিকর্তা এই মানবত্ব। সেই মানবত্বের গুণে যখন সৃষ্টিটা হলো, এই যে সৃষ্টিটা হলো, সেই সৃষ্টিটা হয়ে যাবার পর কার জন্য মানে লক্ষ্য কে? লক্ষ্য পাঠক। খুব মানে পাঠক ওই ভোক্তা অর্থে। এবার ভোক্তা যখন সেটা পাঠ করছেন বা শুনছেন বা দেখছেন, এতকিছুর পর ভোক্তার মনের মধ্যেও বিভিন্ন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ঘটছে। সেই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফল কি হতে পারে? ভরত তাঁর নাট্যশাস্ত্রে বলে গিয়েছেন—রস। রিডার্স সাইকোলজি। ভোক্তার মানসিক প্রতিক্রিয়াটা হচ্ছে রস।

এই যে প্রক্রিয়াকরণটা, লক্ষ্য করে দেখুন এটা কিন্তু সঞ্চরণশীল। এটা কোনো একটা জায়গায় স্থির হয়ে নেই। এই পুরো প্রক্রিয়াটায় মানে জগত লেখকের মনে আসছে, মানে স্রষ্টার মনে আসছে; স্রষ্টার মনের নিজত্ব থেকে মানবত্বে উত্তীর্ণ হচ্ছে; মানবত্বে উত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রকাশিকবিত্ব হচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে; সেই সৃষ্টি আবার ভোক্তা উপভোগ করছেন; তাঁর মনের মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছে; প্রতিফলিত হওয়ার পরও আরো অনেক কিছু হতে পারে, সেখানেও নিজত্ব থেকে মানবত্বে যেতে পারে, যাওয়ার পরে সমালোচনা সাহিত্য তৈরি হতে পারে। মানে এই এতদূর পর্যন্ত যেতে পারে। পুরোটাই সঞ্চারিত হচ্ছে। সেই জন্য রবীন্দ্রনাথের এই সাহিত্যতত্ত্বকে জগদীশ ভট্টাচার্য বলেছিলেন ‘সঞ্চরণ তত্ত্ব’।

আমরা এই সঞ্চরণ তত্ত্বের মানে সঞ্চরণ তত্ত্বের কথা মাথায় রেখে, এই নিয়মের কথাটা মাথায় রেখে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যতত্ত্ব পড়ার চেষ্টা করব। ফলত আমরা দেখব কোন অংশে রবীন্দ্রনাথ কবি প্রকৃতির কথা বলছেন, কোন অংশে রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টির কথা বলছেন—অর্থাৎ লেখায় কি কি উপাদান থাকতে পারে, সাহিত্যে মানে যে মানে সাহিত্যটা সৃজিত হলো বা সৃষ্টি হলো তার কি কি উপাদান থাকতে পারে, যে উপাদানগুলো থাকলে আমরা তাকে যথার্থ সাহিত্য বলব; আবার ভোক্তার কি কি গুণাবলী থাকতে পারে তবে আমরা তাকে যথার্থ ভোক্তা বলব, নইলে সমস্যা আছে।

এবার আমি আপনাদের বলতে পারি যে ভোক্তা তো ভোক্তাই, মানে ভোক্তার ভালো-মন্দ বিচার কিভাবে হয়? ভোক্তার ভালো-মন্দ বিচার রবীন্দ্রনাথ নিজেও করেছেন, করেননি এমনটি নয়। ‘সাহিত্যের বিচারক’ প্রবন্ধ পড়লেই সেই অংশ আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। যখন আমরা পড়ব সেটা দেখার চেষ্টা করব। আরও আশ্চর্যের বিষয়, কাশ্মীরের আলংকারিক রাজশেখর, আচার্য রাজশেখর, তিনি কিন্তু সমালোচকদের শ্রেণীবিভাগ করেছেন। তিনি কিন্তু এমন সমালোচকেরও কথা বলেছেন যাদেরকে বলা হচ্ছে ‘স্বতৃণাভ্যবহারী’—অর্থাৎ ঘাসখেকো সমালোচক!

অর্থাৎ ভোক্তাদের মধ্যেও মানে যথার্থ ভোক্তা হতে গেলে যে তার কিছু উপায় জানতে হবে, সেই কথাও কিন্তু প্রাচীন অলংকার শাস্ত্রে স্বীকৃত। এমনকি অভিনবগুপ্ত, যিনি ধ্বনিবাদ আর রসবাতকে মিলিয়ে রসধ্বনিবাদের স্রষ্টা—আমরা এমনটা ভাবতে পারি, মানে এই প্রস্থানের আদি আচার্য, রসধ্বনিবাদ বলে যে প্রস্থান সেই প্রস্থানের আদি আচার্য—সেই অভিনবগুপ্তও বলছেন যে ভোক্তাকে, রসিকে ‘সহৃদয় হৃদয়সংবাদী’ হতে হয়। যদি তিনি সহৃদয় হৃদয়সংবাদী না হন, তাহলে কবির হৃদয়ের সংবাদ তাঁর হৃদয়ে যথার্থভাবে প্রতিফলিত হবে না। এবং এই সহৃদয় হৃদয়সংবাদী কি আমি জন্মে জন্মেই হয়ে গিয়েছি? আমি কি এমনিই হয়ে যাব? মানে একটা একটা কবিতা পড়ে আমি আমার মত দিয়েই কি প্রমাণ করে দিতে পারি আমি সহৃদয় হৃদয়সংবাদী? অভিনবগুপ্ত বলছেন না। অভিনবগুপ্ত বলছেন আমাদের মন অর্থাৎ মনোদর্পণ, যেখানে সাহিত্য প্রতিফলিত হয়, যেখানে নাটক-কাব্য প্রতিফলিত হয়—আমি সবটাকেই যদি সাহিত্য হিসেবে ধরি, সব মানে সমগ্র সাহিত্য প্রতিফলিত হয় যে মনোদর্পণে—এই মনোদর্পণ মলাবরণে আচ্ছন্ন থাকে অনেক সময়। আমরা এই জগৎ-সংসারের সঙ্গে প্রতিনিয়ত ক্রিয়া করি। সেই ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মন মলাবরণে আচ্ছন্ন হয়। তাই নিরন্তর সত্যানুশীলনের মধ্য দিয়ে, ওই বিভিন্ন রীতি-পদ্ধতিগুলোর মধ্য দিয়ে আমাদের সেই মনের মলা মনের মলাবরণ অপসৃত হতে হবে।

যদি মনের মলাবরণ অপসৃত হয় অর্থাৎ মনোদর্পণের মলাবরণ অপসৃত হয়—মল অর্থাৎ এখানে ময়লা—তাহলে যথাযথ সাহিত্য প্রতিফলিত হবে। আমাদের মনোদর্পণ স্বচ্ছ হলে সাহিত্যের প্রতিফলনও স্বচ্ছ হবে। এবং তখন আমরা সহৃদয় হৃদয়সংবাদী হয়ে উঠব, যথার্থ রসনিষ্পত্তি হবে এবং কবি ঠিক কি বলছেন আমাদের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সেই জায়গাটা উন্মোচিত করতে পারব। স্রষ্টা কি বলছেন সেই জায়গাটাকে উন্মোচিত করতে পারব। খুব স্বাভাবিকভাবে এই যে আমাদের একটা ঐতিহ্য ছিল বা এই যে আমাদের একটা ঐতিহ্য আছে সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্রের বা ভারতীয় কাব্যতত্ত্বের, রবীন্দ্রনাথ সেটা কতদূর অনুসরণ করছেন এই তিনটে ক্ষেত্রেই, সেটা আমরা প্রবন্ধগুলো পাঠ করে বোঝার চেষ্টা করব।

অর্থাৎ কবির ধর্ম—কবির যে মানে স্রষ্টার ধর্ম; স্রষ্টা যে সৃষ্টিটি করল, সেই সৃষ্টির ধর্ম—সৃষ্টির কি কি গুণাবলী কি কি উপাদান থাকতে পারে যার মধ্য দিয়ে একটা সামান্য সৃষ্টি অসামান্য হয়ে যেতে পারে; আর ভোক্তা—তিনি কিভাবে এই সৃষ্টিকে উপভোগ করতে পারেন, কিভাবে তাঁর মধ্যে সঞ্চারিত হয় সমস্ত কিছু, যার মধ্য দিয়ে যথার্থ রসনিষ্পত্তি বা যথার্থ উপভোগ সম্ভবপর হয়ে ওঠে। এই পুরো প্রক্রিয়াকরণটা রবীন্দ্রনাথ কিভাবে সাজাচ্ছেন, কিভাবে বলছেন, সেইটা সাহিত্য গ্রন্থ ধরে আমরা বোঝার চেষ্টা করব। এই হচ্ছে আমাদের সাহিত্য গ্রন্থ পড়ার মূল প্রজেক্ট বা মূল পরিকল্পনা।

এই সমস্তটা নিয়ে আপনাদের কোন আপত্তি, ভাবনা, বক্তব্য বা আমি ভুল বলেছি এরকম কিছু আছে? নইলে পরের অংশে যাচ্ছি।

বক্তা ৭ (শ্রোত্রী): হ্যাঁ স্যার, আপনি বললেন কবির ধর্ম, সৃষ্টির ধর্ম, আর সৃষ্টির মধ্যে কি কি গুণাবলীর দ্বারা সেটি অসাধারণ হয়ে ওঠে?

বক্তা ১: হ্যাঁ, ওটা সৃষ্টির ধর্মের মধ্যেই।

বক্তা ৭: হ্যাঁ।

বক্তা ১: মানে প্রথম কথা হচ্ছে কবির ধর্ম, মানে কোন কোন ধর্মের গুণে কবি সৃষ্টি করতে পারেন। যেমন ধরুন আমি যদি বলি যে সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্রে বলা হচ্ছে কবির মানে কবিত্বের তিন উপাদান। কবির মানে তিনটি ধর্ম কবির মধ্যে থাকতে হয়। একটা হচ্ছে কবি-প্রতিভা, একটা হচ্ছে ব্যুৎপত্তি, আর একটা হচ্ছে অনুশীলন। মানে এগুলো কবি-ধর্ম। এই তিনটে ধর্ম কবির থাকতে হয়। এবার এই কবি-প্রতিভার কথা বলতে গিয়ে তারা বলছেন কবি-প্রতিভা কেমন হয়? না, সেটা ‘অঘটন-ঘটন-পটীয়সী বুদ্ধি’ থাকবে কবির, আর ‘অপূর্ববস্তু-নির্মাণক্ষমা প্রজ্ঞা’ থাকতে হবে তার। এটা হচ্ছে ধরুন কবি-প্রতিভা, এক নম্বর।

এবার আমি যদি ব্যুৎপত্তির কথা বলি, ব্যুৎপত্তি অর্থাৎ তার ব্যাকরণে ব্যুৎপত্তি থাকতে হবে, বাস্তব অভিজ্ঞতা তার ঠিকঠাক ভাবে থাকতে হবে, তার বোধ ঠিকঠাক ভাবে থাকতে হবে, শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্য এবং সংস্কার তার ঠিকঠাক ভাবে থাকতে হবে। সেটা হচ্ছে তার ব্যুৎপত্তির জায়গাটা। যে এই জায়গাগুলো তিনি একদম মানে তুখোর, তিনি জানেন। মানে ভালো জানেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ ধরুন আমি যদি বলি রবীন্দ্রনাথ যখন গ্রিক মিথকে ব্যবহার করে তার জীবনদেবতা তত্ত্ব নির্মাণ করছেন, তাহলে তো ওই গ্রিক মিথের দায়মন মানে এই এই ব্যাপারটা—প্লেটো যে অর্থে দায়মন বলেছিলেন এবং কি অর্থে দায়মন হতে পারে—সেই জায়গাটা তিনি স্পষ্ট, তিনি বোঝেন। তিনি বোঝেন না এমন নয়, তিনি সেটা পড়েছেন। বা আমি যদি বলি ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’, ব্রজবুলিতে লিখছেন রবীন্দ্রনাথ, তার মানে ব্রজবুলি নিয়ে তার ব্যুৎপত্তি আছে।

বক্তা ৭: হুম।

বক্তা ১: তিনি সেটা অর্জন করেছেন। এবার এই অর্জনের জায়গাটা হচ্ছে কি? অনুশীলন। প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্র্যাকটিস। মানে শুধু প্রতিভা থাকলেই যে আমি লিখতে পারব এমনটা নয়। হয়তো কিছু চমকপ্রদ কবিতা আমি লিখে ফেললাম, কিন্তু যদি আমার অনুশীলন না থাকে, প্র্যাকটিস যদি না থাকে যথার্থ অনুশীলন—এই অনুশীলন শব্দটাকে না শুধু ‘অভ্যাস’ এই হিসেবে ধরলে চলবে না। এটা মানে এটাও আমি জগদীশ ভট্টাচার্য থেকে ধার করেই বলছি। মানে বঙ্কিমচন্দ্র যে অর্থে অনুশীলন বলেছিলেন, যে ওই চারখানা বৃত্তির অনুশীলন, প্রস্ফুরণ, সামঞ্জস্য বিধান হতে হবে। মানে প্র্যাকটিস অর্থাৎ ওই সামঞ্জস্য বিধানের মধ্য দিয়ে প্র্যাকটিস। সমস্ত কিছুই তো আমার কাছে আছে, কিন্তু আমি কোথায় কতটা কি ব্যবহার করব? মানে সোজা কথায় একজন যখন রান্না করছেন, তখন তিনি তো জানেন যে কতটা কি পরিমাণে ব্যবহার করবেন। পরিমাণের গোলমাল হয়ে গেলে খুব সমস্যা। এবার দেখুন, এই রান্নাটা কিন্তু প্র্যাকটিসের ওপর নির্ভর করে। পুরনো দিনের মায়েরা খুব ভালো রান্না করতে পারেন। রান্না করে করে প্র্যাকটিস করে করে তাদের ওই ব্যুৎপত্তিটা নির্মাণ হয়ে গিয়েছে। ফলত যে প্রতিভাটা ছিল সেটা আরো শানিত হয়েছে। সামান্য যদি ওই হলুদ দিয়ে, নুন দিয়ে আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে একটা ঝোল রান্না করে দেয়, সেটাই মনে হয় অপূর্ব। তার কারণ এই প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্র্যাকটিস, এই অনুশীলনের ফলে তার ওই মানে নিয়ন্ত্রণ করতে পারার ক্ষমতার ফলে যে কোথায় কি দেব আর কি দেব না। এই মানে মানে আমার আমার লোভ নেই, মানে আমার আমি খুব ভালো অনুপ্রাস জানি, আমি অনুপ্রাস ঢোকাবোই—এরকম নয়। আমি জানি এই মশলা দিলে খুব ভালো টেস্ট হয়, ওটা এইখানে দেবই—এরকম নয়। আমি বরং এটা ভাবব, না দিলেও কিভাবে ভালো হয়ে যেতে পারে। খুব সহজে কিভাবে ভালো হয়ে যেতে পারে।

এটা হচ্ছে প্রথম জায়গা, মানে এই কবির এই ধর্মের জায়গাটা।

বক্তা ৭: হুম।

বক্তা ১: এরপর দ্বিতীয় আমি যেটা বলছি, যে যে সৃষ্টিটা হলো, তার ভেতরে কি কি উপাদান থাকতে পারে। যেমন ধরুন আমি বলি, পড়াতে গেলেও এটা বলব যে রবীন্দ্রনাথ বলছেন যে মানে একটা সৃষ্টির ক্ষেত্রে ‘চিত্র দেহ, সংগীত প্রাণ’। তাহলে এই উপাদান হিসেবে দেখুন চিত্র আর দেহ আমরা মানে মানে চিত্রকে দেহ হিসেবে পাচ্ছি, মানে একটা উপাদান হিসেবে পাচ্ছি চিত্র। এবার কাকে চিত্র বলছেন সেটা যখন আমরা পড়ব নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা করব। এবং সংগীত মানে প্রাণ বলছেন, মানে তার মানে এটাও একটা উপাদান। তাহলে এই মানে কাব্যের ভেতরে কি কি উপাদান থাকতে পারে? সেখানে ধরুন অলংকার হতে পারে, ভাষা হতে পারে তার, রীতি হতে পারে তার, অনেক কিছু হতে পারে। আমি কোনো তত্ত্ব প্রয়োগ করলাম এমন হতে পারে। ধরুন জীবনানন্দ দাশ। জীবনানন্দ দাশ মানে আমি যদি বলি মানে তত্ত্ব ব্যবহার করছেন, তিনি সুররিয়ালিজম প্রয়োগ করছেন কাব্যে। সুররিয়ালিজমের তত্ত্ব আমি যদি ভাবি এটা, বা ধরুন জীবনানন্দ দাশ এক্সিস্টেনশিয়ালিজম প্রয়োগ করছেন—অস্তিত্বের সংকট, এক্সিস্টেনশিয়াল ক্রাইসিস যেটা—সেই মানে ভাবনাগুলো প্রয়োগ করছেন। তো এইগুলো হতে পারে কাব্যের উপাদান। এটা হচ্ছে দ্বিতীয় ভাব মানে স্তর।

তৃতীয় স্তর হচ্ছে এই যে কাব্য সৃজিত হলো, মানে স্রষ্টা এই যে সৃষ্টিটা করলেন, সেটা কি শুধু ওই আমি সৃষ্টির আনন্দে সৃষ্টি করে ফেলে রেখেছি এমনটা তো নয়? আমি সৃষ্টিটা করছি তার একটা লক্ষ্য আছে তো—পাঠক। মানে ভোক্তা। ভোক্তার জন্য সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু কলাকৈবল্যবাদী নন। মানে কোনো অর্থেই রবীন্দ্রনাথ শুধু ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’-এর মানুষ নন। মানে সৃষ্টির আনন্দেই সৃষ্টি করেছি এমন নয়। ভোক্তা কি বুঝলেন, কিভাবে নিলেন—এ নিয়ে তাঁর মানে মাথা ব্যথা নেই, এমনটা নয় কিন্তু। লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছবে, এটা খুব মানে আকাঙ্ক্ষা। এবং লেখার মূল উদ্দেশ্যই তো ভোক্তা। এই ভোক্তা হচ্ছে তৃতীয় স্তর। ভোক্তা কিভাবে পুরো ব্যাপারটাকে উপভোগ করবেন…

বক্তা ৭: স্যার, অনুশীলন, ব্যুৎপত্তি আর একটা কি বললেন? ওই তিনটের মধ্যে?

বক্তা ১: প্রথমে বলেছি কবি-প্রতিভা।

বক্তা ৭ ও অন্য একজন: প্রতিভা। কবি-প্রতিভা।

বক্তা ১: কবি-প্রতিভা, দ্বিতীয় ব্যুৎপত্তি…

বক্তা ৭: আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে স্যার। ঠিক আছে।

বক্তা ১: এই তিনটে। তো এবার যেটা বক্তব্য, হ্যাঁ আমি শেষ করি তারপরে শুনছি। মানে আমি তৃতীয়টা শেষ করে নিয়ে শুনছি।

সেটা হচ্ছে যে এই যে ভোক্তা, মানে আমি কাব্য পাঠ করলেই ভোক্তা হয়ে যাব সেটা নয়, তারও তো একটা মানদণ্ড থাকবে। সুরসিক তো হতে হবে। লক্ষ্য করে দেখুন, আমি উদাহরণ দিতেই পারি আপনাদের এখন। ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের ‘সোনার তরী’ কবিতা। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় পড়লেন। পড়ে যে ব্যাখ্যাটা আমাদের কাছে দিলেন, সেটা কি ঠিকঠাক ব্যাখ্যা? মানে কবি দ্বিজেন্দ্রলালের কাছ থেকে এই ব্যাখ্যা আমরা আশা করি? মানে ওই কবিতাটার ক্ষেত্রে অন্তত দ্বিজেন্দ্রলাল রায় যে যথার্থ ভোক্তা, তিনি যথার্থ উপভোগ করতে পেরেছেন, তিনি সুরসিক, তাঁর রসনিষ্পত্তি হয়েছে—এমনটা তো আমরা বলতে পারব না। এই মানদণ্ডটা কি হতে পারে? কাকে আমরা সুরসিক বলব? যার ওই রসবোধ বিচারকে, যার ওই কাব্য বিচারকে আমরা গুরুত্ব দেব এবং সেই গুরুত্ব দিয়ে বুঝব যে হ্যাঁ, এটা যথার্থ কাব্য হয়েছে। সেই জায়গাটা কি? সেই মানদণ্ডগুলো কি? তার গুণ কি থাকতে পারে? সেই বিষয় নিয়ে কথা বলা।

এটা আমি বলতে চেয়েছি অলংকার শাস্ত্রে ছিল, রবীন্দ্রনাথও এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলছেন। সেক্ষেত্রে কোনটা তিনি নিজের মত প্রকাশ করছেন, কখনো অলংকার শাস্ত্রের মতের সঙ্গে নিজের মত একীকৃত করছেন—এই হচ্ছে আমার মূল ভাব। এবার আপনারা বলুন।

বক্তা ৮ (শ্রোত্রী): স্যার, সঞ্চরণ তত্ত্ব আর মনোদর্পণ—এটা একটু সরলভাবে একটু বলবেন আরেকবার? তাহলে খুব ভালো হয়।

বক্তা ১: আমি আমি বলছি। দেখুন, একদম মানে শব্দটার অর্থ ধরে বোঝার চেষ্টা করুন। সঞ্চরণ মানে কি? যা সঞ্চারিত হয়, স্থির নয়। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাচ্ছে। এবার লক্ষ্য করে দেখুন, স্রষ্টা কি করছেন? স্রষ্টা এই জগৎ-সংসারকে দেখছেন, মানে বাইরের জগতকে দেখছেন। দেখার পর ওটা সঞ্চারিত হয়ে তাঁর মনে এলো। সঞ্চারিত হলো? এই যে মনের জগতে এলো, সেই মনের জগতে আসার পর যখন ওটা আমার ব্যক্তিগত হয়ে থাকে, তখন তো আমি সৃষ্টিটা করতে পারব না। কেননা সৃষ্টি তো ব্যক্তিগত থেকে নির্বিশেষে পৌঁছাতে হবে।

মানে এই সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্রে এরকমও একটা কথা বলা হয় যে, কবি এই জগতের সঙ্গে ‘ভূমিস্পর্শ মুদ্রা’য় থাকেন। ভূমিস্পর্শ মুদ্রা অর্থাৎ দেখবেন ওই মধ্যমা দিয়ে জাস্ট মাটিটাকে ছুঁয়ে থাকা। এবং কবির দৃষ্টি হচ্ছে তটস্থ দৃষ্টি। অর্থাৎ তটে দাঁড়িয়ে তিনি দেখেন জীবনের নদী বয়ে যাচ্ছে। কখনো সখনো সেই নদীতে দু-একবার ডুব তিনি দেন, কিন্তু জীবনের নদীতে তিনি ভেসে যান না। যার জন্য মানে কবির সঙ্গে ওই জীবনের নদীর যে উপাদানগুলো খুব ভালো একটা কানেকশন হয় না, মানে একটা ডিটাচমেন্ট কোথাও না কোথাও হয়। অ্যাটাচমেন্ট এবং ডিটাচমেন্ট দুটোই সমান্তরালে আছে।

এবার তার মানে ওটা ব্যক্তিগত হয়ে নেই। রবীন্দ্রনাথ সেটাই বলছেন যে ওই নিজত্ব অংশে মনের মধ্যে থেকে সাহিত্য সৃষ্টি হয় না। ভালো সৃষ্টি মানে হয় না কোনোদিন। আমাকে ওটা থেকে বেরিয়ে এসে মানবত্ব অংশে পৌঁছাতে হবে। সামান্য থেকে বিশেষে পৌঁছাতে হবে। বিশেষ থেকে… মানে ভুল বললাম, মানে বিশেষ থেকে সামান্য পৌঁছাতে হবে, মানে নির্বিশেষে পৌঁছাতে হবে। এই যে সামান্য বা নির্বিশেষের যে অংশটা, এই মানে দ্বিতীয় যে অংশটায় গেল আমি যা দেখলাম সেটা, সেটা হচ্ছে মানে সেই অংশটা হচ্ছে মানবত্ব। তাহলে আবার সঞ্চারিত হলো নিজত্ব থেকে মানবত্বে কবির মনের মধ্যে।

এবার এই যে মানবত্ব, সে সৃষ্টি করল। সে এবার বিভিন্ন পারম্যুটেশন কম্বিনেশন করছে। আমারই চেতনার রঙে পান্না সবুজ, অমুক লাল হলুদ—এসব করে টরে কবি ছোটকে বড় করছেন, আলগাকে ভরাট করছেন, করে সৃষ্টি করলেন। মানে আরও একবার সঞ্চারিত হলো, এগিয়ে গেল সেটা। মানে যা দেখেছি হুবহু সেটা থাকলো না। এবার ভোক্তার কাছে সেটা যাচ্ছে। মানে সৃষ্টিটা তো হয়ে গেল। সেই সৃষ্টিটা আমি যখন পাঠ করলাম, আবার সঞ্চারিত হয়ে আমার মনে এলো। এবার আমি আমার মনের ভাবনা দিয়ে সেই বিষয়টাকে বোঝার চেষ্টা করছি। তাহলে দেখুন, এই পুরোটাই তো এক মন থেকে আরেক মন, এক স্থান থেকে আরেক স্থানে সঞ্চারিত হয়ে যাওয়া। তাই রবীন্দ্রনাথের এই যে সাহিত্যতত্ত্ব, যেটা এই তিনটে অংশের কথা বললাম আমি—স্রষ্টা, সৃষ্টি এবং ভোক্তা—এই পুরোটাই সঞ্চারিত হয়, তাই এটা সঞ্চরণ তত্ত্ব। বোঝাতে পারলাম?

বক্তা ৮: থ্যাংক ইউ স্যার।

বক্তা ১: হ্যাঁ, আর দ্বিতীয় একটা কি বললেন যেন আপনারা?

বক্তা ৯ (শ্রোত্রী): স্যার, আমি…

বক্তা ১: সঞ্চরণ তত্ত্ব ছাড়া আরেকটা যেন কি বললেন?

বক্তা ৯: আমি জানতে চাইছিলাম যে কি মুদ্রায় থাকেন কবি? আপনি একটা বললেন, কবি একটি মুদ্রায় থাকেন যে নামটা বললেন সেইটা একটু মিস করেছি।

বক্তা ১: ভূমিস্পর্শ মুদ্রা।

বক্তা ৯: ভূমিস্পর্শ মুদ্রা।

বক্তা ১: ভূমিস্পর্শ মুদ্রা। পুজোর সময় দেখবেন ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় মানে পুজোর ব্যবহার হয়।

বক্তা ১০ (শ্রোত্রী): স্যার, এই ভূমিস্পর্শ মুদ্রা কি গৌতম বুদ্ধের যেটি ওটাই বলা হচ্ছে?

বক্তা ১: ভূমিস্পর্শ মুদ্রা দেখুন, একদম সোজা কথায় বলি ভূমিস্পর্শ মুদ্রা মানে টাচ করে থাকা। আমি লেপটে নেই কিছুর সঙ্গে, আমি মেখে নেই কিছুর সঙ্গে। আমি জাস্ট ছুঁয়ে আছি। এই জগৎ-সংসারের সঙ্গে কবি লেপটে থাকেন না, ছুঁয়ে থাকেন।

বক্তা ৭: স্যার, কিন্তু মাটির কাছাকাছি এরকম কিছু ব্যাপার?

বক্তা ১: দেখুন, মাটির কাছাকাছি আছি কিন্তু মাটির গভীরে নেই।

বক্তা ৭: হ্যাঁ।

বক্তা ১: মানে মাটিটাকে আমি… দেখুন, সৃষ্টি কোনদিন মাটি ছাড়া হবে না।

বক্তা ৭: হুম।

বক্তা ১: মানে আমি যে সৃষ্টিটা করছি আমি কি বললাম, ভরত বলেছেন ‘লোকবৃত্তানুকারণং’। মানে নাটক কি? নাটক লোকবৃত্তির অনুকরণ। আপনি লোককে বাদ দেবেন কোথায়? লোক তো মাটিতেই আছে।

বক্তা ৭: হুম।

বক্তা ১: এবং ভরতের নাট্যশাস্ত্রে একটা অদ্ভুত মজার তথ্য আছে যে ভরত যখন নাটক লিখলেন, মানে প্রথম নাটক লিখে যখন… ভরত তো নাটক লিখেছিলেন, মানে এই গল্পটা আছে। মানে একটা গল্প, এটা কিন্তু সত্যি এরকম ভেবে নিলে সমস্যা। যে গল্পটা এরকম যে দেবতারা অর্থাৎ ইন্দ্র ভরতকে বললেন যে নাটক লেখো। মানে একটা মানে চতুর্থ বেদ অব্দি আছে, পঞ্চম বেদ কিছু হোক মনোরঞ্জনের জন্য। নাটক হচ্ছে সেই পঞ্চম বেদ। নাটক লিখলেন। নাটক লেখার পর দেবতারা বলছেন যে নাটক মানে যখন মানে ভরত নিয়ে গেলেন তাদের সামনে, তখন দেবতারা বলছেন এই নাটক আমরা অভিনয় করতে পারব না। আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এটা পৃথিবীবাসীকেই দেওয়া হলো, পৃথিবীবাসীই করতে পারবে। কেন? নাটক তো লোকবৃত্তানুকারণং, তাহলে দেবতারা কি করে সেই লোকবৃত্তির অনুকরণ করতে পারবেন? এক।

দ্বিতীয়ত হচ্ছে, যে আটখানা স্থায়ী ভাব আমাদের মধ্যে আছে যেগুলো রসে পর্যবসিত হয়, দেবতাদের তো এই আটটা স্থায়ী ভাব থাকবে না। স্বর্গে তো শোক নেই। অনন্তকাল বসন্ত বিরাজ করে এবং শুধুই আনন্দ থাকে, শোক কখনো থাকে না। তাহলে শোক যদি না থাকে তাহলে করুণ রসের নাটক কিভাবে হবে? অথচ সংস্কৃত সাহিত্যে অধিকাংশ শ্রেষ্ঠ কাব্য করুণ রসের। এটা রবীন্দ্রনাথই লক্ষ্য করিয়ে গেছেন আমাদেরকে। আপনি মেঘদূতের কথা ভাবুন, আপনি রামায়ণের কথা ভাবুন না। রামায়ণ কি শেষ পর্যন্ত করুণ রসের কাব্য নয়? মহাভারত শান্ত রসের কাব্য। রাম-সীতার মিলন না হয়ে সেই করুণেই তো পর্যবসিত হচ্ছে। সারাটা জীবন এই দুটো মানুষের এক না হতে পারার গল্প। বিভিন্ন সমস্যায়, সে নিয়ে ওই ফালতু বিতর্কে ঢুকে লাভ নেই। কিন্তু আমি যদি কাব্যের রসের ক্ষেত্রে গিয়ে পৌঁছই, তাই এটাও তো তাই। শোক থেকে উদ্ভূত হয়েছিল শ্লোক। তাহলে দেবতারা এই অভিনয়টা করবে কি করে? এটা তাদের পক্ষে সম্ভব নয় করা, তারা ছেড়ে দিল নাটক।

ফলত আছে মানে সবটাই কিন্তু এই পার্থিব জগত। সৃষ্টি যা হচ্ছে আমি অলৌকিকের কল্পনা যদি করি, সেই অলৌকিকের কল্পনা লৌকিকের ভেতর দিয়েই হবে। লৌকিককে অতিক্রম করতে চেয়ে হবে, লৌকিককে অস্বীকার করে নয়। কিন্তু আমি বলছি কবির ভাবনার কথা। মানে কবি কোন গুণে এই সৃষ্টিটা করতে পারেন? আমরা এই জগতের সঙ্গে লেপটে থাকি। আমার মায়ের মৃত্যু আমার কাছে ব্যক্তিগত শোক। আমি সেই মায়ের মৃত্যু নিয়ে কোনোদিন সেই শোক অতিক্রম করে খুব ভালো সাহিত্য রচনা করতে পারব না। কেননা আমি ওই স্থায়ী ভাবটাকে অতিক্রম করতে পারছি না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ অনায়াসে বলতে পারেন তাঁর বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে যে, আমার বাবা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জগতের সকলের হলো। কি মানে সুন্দর একটা উপমা ব্যবহার করছেন রবীন্দ্রনাথ, শান্তিনিকেতন প্রবন্ধমালায় পাবেন আপনারা এটি কখনো পড়লে, যে বৃন্তচ্যুত ফল যেমন ওই বৃন্তচ্যুতির মধ্য দিয়ে জগতের সবার হয়ে যায় তখন সে আর গাছের নয়, তেমন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমার বাবা জগতের সকলের হয়ে গিয়েছেন, তিনি আর শুধু আমার পরিবারের সকলের নন।

এই কথাটা বলতে গেলে তো আমার ডিটাচমেন্ট দরকার। আমি পিতৃশোকের অ্যাটাচমেন্ট যদি কাটাতে না পারি, আমি সারাজীবন বাবার মৃত্যুর শোক নিয়ে খালি আহারে উহুরে করে যাব। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সেই আহা উহুকে অতিক্রম করে এমন একটা কথা বলবেন, যেটা অমৃতের পথের দিশারী হবে। এটাই কবির গুণ।

ব্যক্তিগত জীবনে আমি যদি প্রেমে আঘাত পাই, প্রেমে কোনো মানুষের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হই, সেটা আমার মনে ওই মেঘদূতের অনুভূতি তৈরি করবে না। কিন্তু যখন আমি মেঘদূত কাব্যটা পড়ব, তখন কিন্তু ওই চিরন্তন বিরহী হৃদয়ের যে আবেগ, সেটাকে কেন্দ্র করে আমি রসানুভূতিতে পৌঁছব। এটা তো ওই ডিটাচমেন্টে হয়। বিশেষে এটা হয় না, নির্বিশেষে হয়। বিশেষ থেকে সামান্য গেলে হয়। কবি এই সামান্যর যাত্রী। বিশেষ থেকে সামান্য তিনি যান। আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত যে আবেগ অনুভূতিগুলো, সেইগুলোকে তিনি চোখ আঙ্গুল দিয়ে দেখান যে এগুলো ব্যক্তিগত নয়, এগুলো বিশ্বগত। এটা সকলের এবং এর মধ্য দিয়ে আমাদের সেই সত্যানুভবন করান তিনি। তাই তাঁর মুদ্রা ভূমিস্পর্শ মুদ্রা।

রবীন্দ্রনাথ প্রত্যেকটা মৃত্যু নিয়ে সৃষ্টি করতে পারেন এই জন্য অনায়াসে, আমরা পারব না। মানে সেই যদি সেই কোয়ালিটি থাকে তাহলে পারব নিশ্চয়ই, আপনাদের মধ্যে সেই কবি স্বভাব কারো আছে, পারতেই পারেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে না। মানে এটা খুব স্বাভাবিক, সারা জীবনে আমি পিতৃশোক কাটিয়ে উঠতে পারব না। আর রবীন্দ্রনাথ ওরকম একটা কথা বলে দিলেন। রবীন্দ্রনাথ পঞ্চভূতে বলে দিলেন—মৃত্যুরও একটা জীবন আছে।

এই যে জায়গাটা, এটা তো এই ডিটাচমেন্টে আসবে। আপনারা যদি কখনো ‘দিবারাত্রির কাব্য’ পড়েন, তাহলে এই জায়গাটা আরও স্পষ্ট হবে। যে মানে স্রষ্টা অসম্ভব যে কারণে মানে মানে…

বক্তা ৭: কি করে স্যার?

বক্তা ১: দিবারাত্রির কাব্য পড়লে এই জায়গাটা আরও স্পষ্ট। দিবারাত্রির কাব্যের যে মানে প্রধান চরিত্র দেখুন, অ্যাটাচমেন্ট নেই। আনন্দীকে নিয়েও অ্যাটাচমেন্ট নেই, কাউকে নিয়েই তার অ্যাটাচমেন্ট নেই। সে কবি, সে স্রষ্টা। কবির মানে যার জন্য কবির সঙ্গে প্রেম করা কঠিন। কেননা কবি অসম্ভব রোম্যান্টিক কিন্তু কবি ওই সংসার নিয়ে অ্যাটাচড হতে পারবেন না। সেইটা ভূমিস্পর্শ মুদ্রা, সেই জন্য তাঁর দৃষ্টি তটস্থ দৃষ্টি। বোঝাতে পারছি কি, না এখনও পারছি না?

বক্তা ১১ (শ্রোত্রী): হ্যাঁ স্যার, বুঝেছি।

বক্তা ১২ (শ্রোতা): স্যার, আমার একটা প্রশ্ন ছিল। এই…

বক্তা ১: হ্যাঁ, বলুন।

বক্তা ১২: এই এই ডিটাচমেন্টটা কি কোনভাবে সার্ত্রে বা কামুরা যেভাবে অস্তিত্ববাদের কথা বলছেন, সেইটার সাথে কোনভাবে সম্পর্কিত? মানে ইউরোপ কি এইভাবে ভেবেছিল আমাদের কাছ থেকে নিয়ে?

বক্তা ১: না না, দেখুন অস্তিত্বের সংকটে মানে সার্ত্রে বা কামুরা অস্তিত্বের সংকটে যে ডিটাচমেন্টের কথা বলছেন, সেটা আর এটা কিন্তু এক নয়। মানে ওই ডিটাচমেন্টের মধ্য দিয়ে আপনি কোনদিন আনন্দে পৌঁছানোর কথা ওরা ভাবে না। ওরা সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু ভারতীয় দর্শনে এই ডিটাচমেন্টটা কিন্তু অন্য। মানে অ্যাটাচমেন্ট উইথ ডিটাচমেন্ট। মানে আমি একবারও বলছি না কবি পুরো ডিটাচড হয়ে আছেন। মুদ্রাটা লক্ষ্য করে দেখুন—ভূমিস্পর্শ মুদ্রা, কবি ছুঁয়ে আছেন। মানে সামান্য হলেও কোথাও না কোথাও অ্যাটাচ হয়ে আছেন। অ্যাটাচ না হলে আমি ওই যে স্থায়ী ভাবগুলো আটখানা সেটা আমার ভেতরে আসবে না। আমি ওই আবেগগুলোকেই বুঝতে পারব না। এবং আমি এই অ্যাটাচমেন্টের মধ্য দিয়ে ডিটাচমেন্টে পৌঁছচ্ছি মানে এগুলোই যে জীবনের একমাত্র সত্য, অর্থাৎ মৃত্যুই যে জীবনের একমাত্র সত্য নেগেটিভ দিক থেকে নয়, পজেটিভ দিক থেকে। মানে রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে মৃত্যুর কিন্তু নেগেটিভিটি নেই, জীবনানন্দের ক্ষেত্রে মৃত্যুর নেগেটিভিটি আছে। মানে নেতিবাচক দিক থেকে মৃত্যুকে দেখা আছে। কাজেই ওই অস্তিত্বের সংকটের যে ভাবনাটা ডিটাচমেন্টের, সেটার সঙ্গে এটাকে মেলালে আমার অন্তত মনে হয় না চলে।

এটা কবির ধর্ম। এটা একটা জেনারেলাইজ ধর্ম। যে ধর্মটার মধ্য দিয়ে কবি জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত আবার বিবিক্ত। যেটা ভোক্তারও ধর্ম। যার জন্য ওই সাহিত্যদর্পণে বিশ্বনাথ কবিরাজ বলবেন ‘পরস্বীয় ন পরস্বেতি’, মানে আমি যে পড়লাম পথের পাঁচালী পড়লাম, অপুকে পড়লাম, আমার খুব ভালো লেগেছে পথের পাঁচালী। তাহলে অপুর যে ব্যাপারটা সেটা সেটা কি পর? পরস্বীয়? ‘ন পরস্বেতি’। তাহলে ওটা কি আমার? ‘মমেতি’? ‘ন মমেতি চ’। তাহলে ওটা আমারও নয়। আমার আর পরের এর একটা সান্দ্র অবস্থায় আমি আছি। তাই বলছেন ‘তদা স্বাদো বিভাগাদে পরিচ্ছেদ না বিদ্যতে’। এমন একটা সান্দ্র অবস্থায় আমি পৌঁছে গিয়েছি, যেখানে এটার মধ্য দিয়ে আমি কোন আলাদাাই করতে পারছি না এটা আত্ম পর। এই তুরীয় আনন্দে পৌঁছানোর কথা, কবি এই আনন্দের পথের যাত্রী ভারতীয় দর্শনে, অন্তত রবীন্দ্রনাথের ভাবনায়।

বক্তা ৭: হ্যাঁ, আমারও মনে আমার স্যার একটা কথা আমি এটা আমি জানিনা, জাস্ট আমি একটু এতেকে বলছি। যেহেতু একটু একটু পড়া আছে কামু, হ্যাঁ এটা তো তা মানে দেশ আর মানে এর আলাদা। সময়টাও আলাদা আর আমাদের এটা প্রাচীন সাহিত্যের একটা ব্যাপার। আর ওদের ওটা সেই সময়কার ব্যাপার, ওটা প্রচন্ড সংকটের সময়। হ্যাঁ মানে রেসিজম আরও অনেক রকমের প্রবলেম। সেই জন্য কামুর যেটা ব্যাপার আর এটার সঙ্গে একেবারেই মিলবে না।

বক্তা ১: সময়ের একদম। সময়ের সংকট এই জায়গাটাই একদমই নেই। মানে অস্তিত্ববাদের সংকটটা অনেক দূর পর্যন্ত ওই সময়ের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিতের একটা সংকট।

বক্তা ৭: হুম।

বক্তা ১: সেটাকে অতিক্রম করতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে, কিন্তু এটা কবির একটা সামান্য ধর্ম। যেটা আমাদের ইন্ডিয়ান ফিলোসফি দ্বারা অনেক দূর পর্যন্ত প্রভাবিত। এই যে অভিনবগুপ্তের কথা আমি আপনাদের বললাম, এই অভিনবগুপ্ত কিন্তু শৈব প্রত্যভিজ্ঞা দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও ভেবে দেখুন, রবীন্দ্রনাথ কিন্তু ব্রাহ্ম ধর্মে বিশ্বাসী, মানে বেদান্ত ধর্মে বিশ্বাসী।

বক্তা ১৩ (শ্রোত্রী): স্যার, আমার মনে হয় এখানে বোধহয় বৌদ্ধ ধর্মেরও প্রভাব রয়েছে। বুদ্ধদেব যেভাবে বলছেন…

বক্তা ১: হ্যাঁ, দেখুন মানে বৌদ্ধ ধর্ম তো অনেকে বলেন যে মানে ওই কোনো না কোনো ভাবে মানে বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যেও বেদান্ত দর্শনের প্রভাব থেকেই গিয়েছে। মানে এরকমটাও বলেন অনেকে। ফলত হ্যাঁ, মানে এটা আমার আমি বলতে চাইছি সবটা মিলিয়ে একটা ভারতীয় ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি।

বক্তা ৭: হ্যাঁ, একদম একদম।

বক্তা ১: রবীন্দ্রনাথ সেই ভারতীয় ঐতিহ্য বা সংস্কৃতিকে কিছুটা অনুসরণ করছেন, কিছুটা নিজের ভাবনায়। সেই অংশটাই আমরা উদ্ধার করার বা বোঝার চেষ্টা করব। এই টেক্সটগুলো একদম ধরে ধরে ধরে ধরে লাইন বাই লাইন পড়ে।

বক্তা ১৪ (শ্রোত্রী): বাস্তবতা এবং মাটির সাথে যে সংযোগ।

বক্তা ১: হ্যাঁ।

বক্তা ১৪: বাস্তবতা এবং মাটির সাথে সংযোগ।

বক্তা ১: একদম একদম।

বক্তা ১৫ (নাহিদ): আমার একটু… স্যার, আমার একটু জানবার ছিল। আমি একটু কথা বলতে চাই। আচ্ছা, প্রথমত আমি একটু বলে নিই আমি নাহিদ, বাংলাদেশ থেকে। তো আমি জানতে চাচ্ছি যে আমি এতক্ষণ ধরে শুনছিলাম যে ডিটাচমেন্টের ব্যাপারটা, আমিও ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী হিসেবে আমি টি এস এলিয়টের একটা তত্ত্ব পড়েছিলাম, যেটা উনি বলছিলেন যে ‘Poetry is not an expression of personal emotion or personality, but an escape from it’। অর্থাৎ পলায়নপরতা, ব্যক্তি থেকে পলায়নপরতাই পোয়েট্রি। তো এটা কি এই যে ডিটাচমেন্ট থিওরি যেটা আপনি বলছেন, এটার সাথে কি কোথাও মিল আছে? অর্থাৎ আমি দুইটা পাঠ করার সময় কি কোন কোরিলেটিভ আছে? নাকি দে আর কমপ্লিটলি অ্যাপার্ট? থ্যাঙ্ক ইউ।

বক্তা ১: না দেখুন, এই পলায়নপরতা শব্দটা নিয়ে সমস্যা হতে পারে নাকি? মানে এটা আমিও বলতে চাইছি। এই মানে এই যে ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় থাকা পলায়নপর নয়। মানে আমি আছি সমস্ত কিছুর মধ্যে। মানে আমি যদি রবীন্দ্রনাথের কবি ধর্ম ধরি ধরুন, পালিয়ে যাচ্ছেন এমনটা নয়, ফেস করছেন। ফেস করার জন্য ডিটাচমেন্টটা তৈরি হচ্ছে। যে…

বক্তা ১৪: মানে দূরে দাঁড়িয়ে দেখা।

বক্তা ১: হ্যাঁ, মানে আমি শুধু ওটা…

বক্তা ১৪: দূরে দাঁড়িয়ে দেখা, এইরকম ব্যাপারটা।

বক্তা ১: এক্সাক্টলি, ওই তটস্থ দৃষ্টির কথা যেটা আমি বললাম। সেই তটস্থ দৃষ্টিতে তো মানে আমি জীবন মানে পালিয়ে যাওয়া মানে আমি ওইভাবে সমস্ত কিছু থেকে পালিয়ে যাচ্ছি এইটা কি চলবে? আমার এই জায়গাটা একটু খটকা লাগছে। আপনারা ভেবে দেখুন।

বক্তা ১৫: আমি জানতে চাইছি যে এই জায়গাটা কোরিলেট করে কি না? বিকজ এটা আমার মনে পড়লো। সো আই ওয়ান্টেড টু বি ক্লিয়ার যে এটা আলাদা, দুইটা একেবারেই আলাদা…

বক্তা ১: একেবারেই আ… দেখুন, একটা কথা বলি। যুগে যুগে কালধর্মে কবির ধর্ম কোথাও না কোথাও গিয়ে এক। মানে নইলে সৃষ্টিটা কিভাবে হচ্ছে? সেটা মানে সেই প্রসঙ্গে যদি বলা যায় যে ভাবতে তো মানে ভাবতে তো আমরা পারি। দুটো তুলনীয় অবশ্যই। কেননা সেখানেও একটা ডিটাচমেন্টের কথা আছে। কিন্তু যদি আমি সূক্ষ্ম তাৎপর্যে গিয়ে ভাবি, রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে যে অংশটা আমরা বলছি বা আমাদের প্রাচীন সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্রে যে ডিটাচমেন্টের কথাটা বলছি, যেটা ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় অর্থাৎ একটা ওই বিশেষ সংস্কারের জায়গা থেকে বা তটস্থ দৃষ্টি, তট মানে সেই তটস্থ দৃষ্টির মধ্য দিয়ে কিন্তু ওই পলায়নপর মানসিকতাটা নেই। এইটাই আমি বলতে চেয়েছি। এই জায়গাটা থেকে তো কোথাও একটা সামান্য তফাৎ হলেও হচ্ছে।

বক্তা ১৫: জি, ধন্যবাদ।

বক্তা ২ (ব্রতদা): আচ্ছা, স্যার এই ‘তটস্থ দৃষ্টি’ এই টার্মটার মানে কি?

বক্তা ১: তটস্থ দৃষ্টি… দেখুন, জীবনটাকে যদি আপনি একটা নদী হিসেবে ভাবেন, তাহলে কবি মানে এই নদীতে কখনো একবার বা দুবার অবগাহন করেন, স্নান করতে পারেন। অর্থাৎ জীবন নদীতে ডুব তিনি দেন। কিন্তু এই জীবন মানে আমরা যারা জীবনকে দেখি তারা এই জীবনের ভেতর থেকে জীবনকে দেখি। জীবনের যে স্রোতটা বয়ে চলেছে তার মধ্যেই আছি, তার মধ্যে থেকে জীবনটাকে দেখছি। কিন্তু কবির দৃষ্টিটা আলাদা। কবি তটস্থ দৃষ্টিতে দেখেন। অর্থাৎ তিনি কখনো না কখনো জীবন থেকে অ্যাপার্ট হন। তিনি কখনো না কখনো জীবন থেকে আলাদা হয়ে আসেন, তটে আসেন। এই তট থেকে আলাদাভাবে জীবনটাকে দেখেন।

বক্তা ২: মানে নদী থেকে বেরিয়ে এসে নদীর তটে দাঁড়িয়ে তখন নদীটাকে বোঝাচ্ছে?

বক্তা ১: এক্সাক্টলি। তটে দাঁড়িয়ে জীবন নদীটা কেমন? মানে ওখানে দেখুন কবি কিন্তু বিশেষ না, নির্বিশেষ হচ্ছেন। নিরপেক্ষ হচ্ছেন তখন। কবির লেখার মধ্য দিয়ে, মানে স্রষ্টার সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সেই নিরপেক্ষতার জায়গাটা থাকবে। কোথায় নিরপেক্ষতা? আমি ওই তটে দাঁড়িয়ে দেখছি সংসার সমুদ্রে থাকা একটা মানুষ সাপেক্ষ। আমি তাকে উপস্থাপন করছি সেই সাপেক্ষ হিসেবেই। আমার নিরপেক্ষতাটা এইখানেই। আমি আমার ভাবনা দিয়ে তাকে কোনো একটা পক্ষে নিয়ে চলে যাচ্ছি এমনটা নয়। আমি দেখাচ্ছি এই কনটেক্সটে তার অবস্থানটা এইরকম। সেটা ওটার ভেতরে থাকলে নয়, ওটার বাইরে বেরিয়ে এসে সম্ভব।

সেটা মানে তার অর্থ এই নয় কবি জীবনের বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। তার দেখার দৃষ্টিটা ওই বাইরে বেরিয়ে আসা। তাই তটে দাঁড়িয়ে তিনি সমস্ত জগৎ-সংসারকে দেখেন। বিশেষ থেকে তিনি নির্বিশেষে পৌঁছন। তিনি সমানে তা… মানে ব্যক্তিগত মানে দেখুন মানে এটা রসসাহিত্যের জায়গায় আরও স্পষ্ট হয়, যে ব্যক্তিগত শোক যখন আছে তখন সেটা হচ্ছে আমার জীবন নদীর শোক। কিন্তু আমি যখন সাহিত্যে সে মানে আমি একদম সহজ উদাহরণ দিয়ে, ধরুন আমার মা মারা গেছেন সেটা ব্যক্তিগত শোক। এটা কোনোদিনই বলব না যে খুব ভালো ঘটনা। কিন্তু আমি সেই মায়ের মৃত্যু নিয়ে আমি একটা গল্প লিখলাম। এই গল্পটা আপনারা পড়লেন। পড়ে মনে হলো যে খুব সুন্দর হয়েছে, বেশ ভালো গল্প লিখেছি আমি। এই গল্পটা যখন আমি লিখেছি তখন আমি সে মৃত্যু শোকটা অতিক্রম করেছি। আমি সেটা থেকে কিছুটা ডিটাচড হয়েছি। আমি সারাজীবন যদি ওটা থেকে ডিটাচ হতে না পারি, আমার সেই নিরপেক্ষ দৃষ্টিই জন্মাবে না। আমি সাপেক্ষ দৃষ্টিতে মৃত্যু শোক লিখব। তখন কিন্তু সেটা রসোত্তীর্ণ কাব্য হবে না। কোনোভাবেই সেই রসোত্তীর্ণ জায়গায় যাবে না। আপনারা তখন হয়তো বললেন, বাহ এটা সত্যিই ভালো হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত মায়ের মৃত্যুটাকে কোনোদিন বলবেন না ভালো হয়েছে, ওটা হচ্ছে স্থায়ী ভাব। ওই স্থায়ী ভাবটা রসে যখন যাচ্ছে তখন বিশেষ থেকে নির্বিশেষে যাচ্ছে।

কাব্য-সাহিত্য যখন নির্মিত হয় তখন কবি বলেন বটে কোনো একজন বিশেষ মানুষের কথা। রবীন্দ্রনাথই দেখবেন একটু মানে মানে খুঁটিয়ে পড়লে দেখবেন, মেঘদূত নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যখন লিখছেন তখন বলছেন যে ওই যে যক্ষের বিরহের কথা বলছেন কালিদাস, ওটা যক্ষের বিরহের কথা নয়। ওটা একটা সামান্য ব্যাপার মাত্র। মানে ওটার মধ্য দিয়ে আসলে কালিদাস আমাদেরকে পৌঁছে দিতে চাইছেন সমগ্র বিশ্বজুড়ে অনন্তকালীন যত বিরহী হৃদয় আছে, সেই বিরহী হৃদয়ের বার্তাটা আমাদের কাছে পৌঁছে দিতে চাইছেন। যক্ষের কাহিনী একটা উপলক্ষ্য মাত্র। যার জন্য আমিও মানে বাচ্চাদের পড়াতে গেলেও এই কথাটাই বলি, গল্প যেটা পড়ছ গল্পের সারাংশটা একটা উপলক্ষ্য মাত্র। এই সারাংশের মধ্য দিয়ে স্রষ্টা কিন্তু তাঁর বিশেষ একটা আবেগকে আমাদের কাছে পৌঁছে দিতে চাইছেন। আমরা সেই আবেগকে বোঝার চেষ্টা করব এবং সেই আবেগটা নিজেদের মধ্যে সঞ্চারিত করার চেষ্টা করব। গল্পটা একটা উপলক্ষ্য মাত্র। গল্পের অবশ্যই গল্পটা প্রয়োজনীয় কিন্তু সেই খোলসটার বাইরেও আমাদেরকে বেরোতে হবে। এই অর্থে ওই তটস্থ দৃষ্টির জায়গাটা আসে, যে আমি বিশেষ থেকে নির্বিশেষে যাব। বোঝাতে পারলাম কি? না এখনও পারলাম না?

বক্তা ২: না না, অসাধারণ অসাধারণ।

বক্তা ১৬ (শ্রোত্রী): অনেকটা অনেকটা এইরকম… হ্যাঁ।

বক্তা ১: আচ্ছা, বেশ। তাহলে…

বক্তা ১৭ (শ্রোত্রী): খুব ভালো খুব সুন্দর।

বক্তা ১: না, আপনাদের আর কিছু বক্তব্য থাকলে বলতে পারেন।

বক্তা ১৮ (সৈকত): স্যার, স্যার আমি সৈকত চট্টগ্রাম থেকে। আমার একটা জিজ্ঞাসা ছিল। সেটা হলো দ্বিজেন্দ্রলাল রায় যে সোনার তরীর একটা আলোচনার কথা বলছিলেন, সেটা কোন বইয়ে বা কোথায় পাওয়া যাবে যদি একটু বলেন?

বক্তা ১: ‘রবীন্দ্র-দ্বিজেন্দ্র বিতর্ক’ বলে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। এই মুহূর্তে কোন প্রকাশক সেটা না আমার মনে নেই। এই রবীন্দ্র-দ্বিজেন্দ্র বিতর্ক এই বইটিতে এই পুরো মানে ইতিহাসটা আছে। মানে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দ্বিজেন্দ্রনাথের সম্পর্ক প্রথমে ভালো হওয়া, তারপর বিগড়ে যাওয়া। তারপরেই সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের মানে যে ব্যাখ্যা, মানে দ্বিজেন্দ্রলাল মানে একেবারে মানে রবীন্দ্রনাথকে চেয়েছিলে পুরো কচুকাটা করতে, আমি এই শব্দটা ব্যবহার করছি।

বক্তা ৭: হ্যাঁ, ‘জলি ধাম’।

বক্তা ১: মানে মানে যা তা করেছেন রবীন্দ্রনাথকে। মানে প্রত্যেকটা জায়গা ধরে ধরে একেবারে মানে নস্যাৎ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আপনারা নিজেরা পড়লেই দেখবেন কোনোটাই যুক্তি নয়। মানে সুযুক্তি অনেক পরের কথা, যুক্তি নয়। সুযুক্তি কুযুক্তির বাইরে মানে ঊর্ধ্বে উঠে গেছে ওটা। বেসিক্যালি ওগুলো কোন যুক্তিই নয়। মানে ব্যক্তিগত আ… এই দেখুন, মানে ব্যক্তিগত আক্রোশ সেটা যখনই জড়িয়ে আছে, তখনই কিন্তু যথার্থ সাহিত্য আমি ঠিকঠাক ভাবে মানে বিচার করতে পারছি না। আমি কিন্তু ডিটাচ হতে পারছি না। মানে দ্বিজেন্দ্র মানে যদি তিনি মানে মানে দ্বিজেন্দ্রবাবু যদি বলি এই কথা, তিনি তিনি যদি মানে ওই ব্যক্তিগত আক্রোশের জায়গাটা থেকে সরে শুধুমাত্র সোনার তরীর কাব্যমূল্য বোঝার চেষ্টা করতেন—রবীন্দ্রনাথ কি বলতে চাইছেন? ধ্বনি কাব্য হিসেবে কিন্তু সোনার তরী অসাধারণ কবিতা। মানে একেবারেই রসধ্বনি হয়েছে তাহলে। জীবনদেবতা বলতে তিনি কি বোঝাতে চাইছেন ওখানে, সেটাও যদি তিনি অন্তত বোঝার চেষ্টা করতেন। কিচ্ছু করলেন না তিনি। ওই ওই দেখুন, ওই মানে জীবন নদীর তটে ওঠেননি, জীবন নদীর ভেতরে ঢুকে আছেন। ভেতরে ঢুকে থাকার ফলে সাহিত্যের অন্তর্দৃষ্টি তৈরি হলো না, যথাযথভাবে এলো না।

ও, এইতো মানে আপনাদেরই একজন এখানে জানিয়েছেন দেখুন মেসেজ বক্সে যে ওটি কোথা থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘রবীন্দ্র-দ্বিজেন্দ্র বিতর্ক’। একটু দেখে নেবেন আপনারা। তো সেখানেই আপনারা মানে এই এই পুরো ব্যাপারটা পেয়ে যাবেন। দ্বিজেন্দ্রলালের যে প্রবন্ধ সেটাও পাবেন। রবীন্দ্রনাথ তো আসলে সেইভাবে কোনোদিন ঝগড়াটে নন, মানে ঝগড়া করতে পারেননি। তাঁর হয়ে কাউকে না কাউকে আমাদের ঝগড়া করতে হয় কখনো। তো সেই জন্য দ্বিজেন্দ্রলালের সঙ্গে যে তুমুল ঝগড়া করেছেন এমন মানে তেমনটাও নয়। মানে সেটাও তিনি করতে পারেননি বা করেননি। শুনেইছেন এই বইটিতে, মৃদু কিছু বলেছেন। পাবেন, ওই বইটাতে পুরোটাই পাবেন।

বক্তা ৭: স্যার, দ্বিজেন্দ্রলালের বক্তব্যগুলো এতটাই নিকৃষ্ট বলতে হবে যে উত্তর দেওয়ার মত ছিল না প্রায়। মানে উনি বলেছিলেন যেন ‘যামিনী না যেতে জাগালে না’, এটা খুব অশ্লীল কবিতা। হ্যাঁ, অশ্লীল গান, এরকম ধরনের কথা। মানে এগুলোর উত্তর তো দেওয়া যায় না।

বক্তা ১: হ্যাঁ, এগুলো উত্তর… হ্যাঁ, একদম। ঠিক।

বক্তা ১৯ (ইলিয়া দাস মুখার্জী): স্যার, একটা কথা আমি বলতে চাই। আমি একজন নৃত্যশিল্পী, আমি ইলিয়া দাস মুখার্জী বলছি। আমরা আমি যখন মানে রবীন্দ্রনাথ যখন নৃত্যের পুনরুদ্ধারের জন্য কাজ করছেন এবং নন্দলাল বসুর কন্যাকে দিয়ে প্রথম নাচ করাচ্ছেন মঞ্চে, মানে প্রথম ভদ্রঘরের মেয়েরা মঞ্চে উঠছে, তখন তাকে প্রচন্ড সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। ইভেন মানে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বোধহয় উনাকে মানে বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে এই কথাটাও রবীন্দ্রনাথকে শুনতে হয়েছিল। যতটুকু জানা যায়। কিন্তু সবকিছু উপেক্ষা করে আজকে আমরা ভদ্রঘরের মেয়েরা কিন্তু মঞ্চে, যার ১০০ বছর অতিক্রান্ত হলো।

বক্তা ১: একদম একদম। আপনাদের শঙ্খ শুভময় হয়ে উঠুক। হ্যাঁ।

বক্তা ২০ (শ্রোত্রী): স্যার, আমি একটা কথা বলব? নোটসগুলো কি পাওয়া যাবে? নোটসগুলো কি দেওয়া সম্ভব আছে?

বক্তা ১: হ্যাঁ হ্যাঁ?

বক্তা ২০: নোটসগুলো কি কিছু দেওয়া সম্ভব হবে?

বক্তা ১: মুশকিল হচ্ছে আমি নোটস মানে আমি কোন নোট করে পড়াইনি। আমি খালি এই তথ্যগুলো আমার সামনে বইগুলো খুলে রেখে বইগুলো থেকে তুলে বলেছি। আমি কিভাবে নোট দেবো? আমি যতটুকু জানি আপনাদের ক্লাসগুলো রেকর্ডিং করে বোধহয় দেওয়া হয়। মানে কেউ কেউ দায়িত্ব নিয়ে করেন গ্রুপে যারা আছেন। তো সেইটা বোধহয়…

বক্তা ২ (ব্রতদা): অনেকেই হয়তো নোট নিচ্ছেন এবং তারা নিশ্চয়ই সার্কুলেট করবেন, ধরে নেওয়া যায়।

বক্তা ১: হ্যাঁ, মানে আমার পক্ষে দেওয়া সত্যিই খুব দুষ্কর। মানে আমি ওরকম ভাবে কিছু মানে সাজিয়ে গুছিয়ে বসেছি এমন নয়। মানে আমি কোনোদিন বসি না। মানে কোথায় কি আছে সেটা পয়েন্ট আউট করে নিয়ে আমি আমার মত বলতে থাকি।

বক্তা ২১ (শ্রোতা): না, থাকুক ওভাবে।

বক্তা ৮: আমি কিছুটা লিখেছি, আমি ছবি তুলে পাঠিয়ে দেবো গ্রুপে। যদি আপনাদের কাজে লাগে আর কি।

বক্তা ১: বেশ। আর কিছু?

বক্তা ৭: হ্যাঁ স্যার, এই প্রকাশের যে তথ্যগুলো ছিল, সেই সেই তথ্যগুলো আর কি মানে সব নোট করতে পারিনি।

বক্তা ১: এগুলো সব পেয়ে যাবেন। না, আমি বলছি এগুলো সব পেয়ে যাবেন আপনি প্রশান্ত পালের যে প্রশান্তকুমার পালের যে ‘রবিজীবনী’, তার পঞ্চম খণ্ডে।

বক্তা ৭: পঞ্চম। আচ্ছা, ঠিক আছে।

বক্তা ১: সমস্ত তথ্যগুলো আছে। আমি সেখান থেকে নিয়েই বলেছি। আর চিঠি যে দুটো আমি পড়লাম, সেই চিঠি দুটো আমি ব্যবহার করেছি বিজন ঘোষালের ‘রবীন্দ্র পত্রসমগ্র কালানুক্রমিক’ যেটা তার চতুর্থ খণ্ড। সেখানেই চিঠি দুটো পেয়ে যাবেন।

বক্তা ৭: আরেকবার বলুন স্যার, বিজন…?

বক্তা ১: বিজন ঘোষালের ‘রবীন্দ্র পত্রসমগ্র কালানুক্রমিক’, তার যে চতুর্থ খণ্ড।

বক্তা ১৮ (সৈকত): এইমাত্র একজন দেখলাম ওই বইটি দিয়ে দিয়েছে, ‘রবীন্দ্র-দ্বিজেন্দ্র বিতর্ক’।

বক্তা ১: ব্যাস, তাহলে তো হয়েই গেল।

বক্তা ২২ (শ্রোত্রী): স্যার, আমি একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

বক্তা ১: হ্যাঁ, বলুন দিদি।

বক্তা ২২: বলছি যে এখানে এই মনে এলো কথাটা, তাহলে আমরা এযাবত যেটুকু আত্মজৈবনিক রচনা সেটা উপন্যাস হোক, গল্প হোক পড়েছি—সবগুলো হয়তো ভালো লাগেনি। কিন্তু যেগুলো উত্তীর্ণ হয়েছে, সেখানে কবি কোথাও দেখিয়েছেন সাহিত্য হয়ে উঠ তিনি কিন্তু ওই তটস্থ ভঙ্গিমাতেই ছিলেন নিরপেক্ষ, তাই সেগুলো উত্তীর্ণ হয়েছে তো?

বক্তা ১: একদম।

বক্তা ২২: এইটুকুই জানার ছিল।

বক্তা ১: সেটা মানে এই ভাবনা অনুযায়ী বা এই তত্ত্ব অনুযায়ী আমাদের কাছে তো সেটাই আসে যে, আমি জীবনের কথাও যখন বলছি তখন ওই তটস্থ দৃষ্টিতে নিরপেক্ষভাবেই আমি আমার জীবনকে উপস্থাপন করছি। এবং সেটা রসোত্তীর্ণ হয়েছে বলেই… এবার দেখুন, মানে এখানে একটা সমস্যা থাকে যে এই যে রসোত্তীর্ণ হচ্ছে আমরা বুঝছি, আমি কতটা রসগ্রাহী এই ব্যাপারটাও কিন্তু থেকে যায়। মানে যার জন্য দেখুন মানে আমি পরে বলব ভেবেছিলাম কিন্তু মানে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ বলছেন কিন্তু সমালোচক দু ধরণের হয়। কিছু সমালোচক থাকেন, মানে এখানে ভোক্তা অর্থে, যারা কাব্য সরস্বতীর বরপুত্র। তারা ওই গোটা সৃষ্টিটাকে যদি একটা মানে বাড়ি এই হিসেবে ভাবেন, তো তাহলে ওই অন্দরমহলে ঢোকার প্রবেশাধিকার তারা পান। ‘সাহিত্যের বিচারক’-এই কিন্তু এমন কথা বলছেন। এবং কাব্য সরস্বতীর কোলে উঠে পড়েন ধুলোবালি লাগিয়ে, কাব্য মানে সরস্বতী মানে কাব্যলক্ষ্মী বা সরস্বতী যাই বলুন না কেন, কাব্যের দেবী তিনি মানে সৃষ্টির ক্ষেত্রেই বলি, তিনি সেই ধুলো ঝেড়ে তাদের কোলে তুলে নেন। মানে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে কাব্যের অন্তর্নিহিত অর্থকে বুঝতে পারার ক্ষমতা এই ধরনের ভোক্তা।

আরেক ধরণের ভোক্তার কথা রবীন্দ্রনাথ বলবেন যারা ওই দেউড়ির সমালোচক এরকম বলা যেতে পারে। মানে বাইরের দরজায় দাঁড়িয়ে হাঁকডাক, চিৎকার, চেঁচামেচি। তারা ওই সৃষ্টির অন্দরমহলে ঢুকতে পারে না। ফলত এইটাও কিন্তু ভাবতে হবে আমাদেরকে। মানে এই উভয়পাক্ষিক মানে নিরপেক্ষ দৃষ্টি আমাদের হবে। মানে সেই অন্তর্দৃষ্টি আমার আছে কিনা এটা একটা কথা, আর দ্বিতীয়ত কবি সেই অন্তর্দৃষ্টিতে এটা বিশ্লেষণ করতে পেরেছেন কিনা মানে ওই নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে, তটস্থ দৃষ্টিতে তিনি বিশ্লেষণ করতে পেরেছেন কিনা। যদি তটস্থ দৃষ্টিতে না পারেন, তাহলে তো রসোত্তীর্ণ হবেই না কোনমতে। সেক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে।

বক্তা ২২: হ্যাঁ, ধন্যবাদ স্যার।

বক্তা ১: হ্যাঁ।

বক্তা ২৩ (শ্রোতা): স্যার, প্রতিভা, অনুশীলন আর ব্যুৎপত্তি নিয়ে যেটা বললেন না?

বক্তা ১: হ্যাঁ।

বক্তা ২৩: তা আরেকবার…

বক্তা ১: আমি বলেছিলাম কবির প্রতিভা থাকবে। এই যে প্রতিভা সেটাকে… এক মিনিট।

কবির এই যে মানে প্রতিভা হচ্ছে ওরা মানে সংস্কৃত আলংকারিকরা বলছেন কবি প্রতিভা অর্থাৎ সেখানে দুটো প্রসঙ্গের কথা তারা বলছেন। একটা হচ্ছে তিনি মানে একাধারে তিনি হবেন ‘অঘটন-ঘটন-পটীয়সী বুদ্ধি’, মানে এটা তার প্রতিভার একটা। মানে অঘটনকে ঘটন করে ফেলতে পারবেন, এই পটীয়সী বুদ্ধি তার থাকবে। ধরুন রূপকথার গল্প পড়ছেন। রূপকথার গল্পগুলো তো বাস্তবে কোনোদিন হওয়া সম্ভব নয়। সেই অঘটনকে ঘটন পটীয়সী করতে পারেন। মানে এই ম্যাজিক রিয়ালিজমের গল্প পড়ছেন, যেটা তো বাস্তবে হওয়া সম্ভবপর নয়। কিন্তু সেই অঘটন ঘটন পটীয়সী বুদ্ধি থাকবে তার। আর ‘অপূর্ববস্তু-নির্মাণক্ষমা প্রজ্ঞা’ থাকবে তার। অর্থাৎ এমন বস্তু তিনি নির্মাণ করবেন সেটা অবশ্যই অপূর্ব, কিন্তু সেই যে নির্মাণ করার ক্ষমতা এই এটা মানে এইটা তার কাছে প্রজ্ঞা হিসেবে থাকবে। মানে কোনো না কোনো ভাবে এটা ইনবিল্ট হয়ে যাবে তার মধ্যে। এইটা হচ্ছে কবি-প্রতিভা।

এটা যদি সকলের না থাকে, মানে এই প্রতিভাটা যদি না থাকে আমি চেষ্টা করলেও সৃষ্টি হবে না। এবার হতে পারে, কিভাবে হতে পারে সেটা? সেক্ষেত্রে ওই ব্যুৎপত্তি আর অনুশীলনের জায়গাটাই যেতে হবে। ব্যুৎপত্তির ক্ষেত্রে যেটা বলা হচ্ছে যে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আমার সম্যক ধারণা বা জ্ঞান। ধরুন সেটা আভিধানিক জ্ঞান হতে পারে, মানে শব্দার্থের জ্ঞান ঠিকঠাক ভাবে হতে পারে। আমার যথার্থ অভিজ্ঞতা হতে পারে। আমার পড়াশোনা খুব বেশি দূর নেই কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা আছে, সেই অভিজ্ঞতা লব্ধ ব্যুৎপত্তি আমি অর্জন করতে পারি। আমার যথার্থ বোধ থাকতে পারে।

ধরুন আমি যদি বলি যে বিভূতিভূষণের ব্যুৎপত্তির কথা। বিভূতিভূষণ মানে এইভাবেই বলছি বাপের জন্মে কোনোদিন ওই আফ্রিকার চাঁদের পাহাড়ে যাননি। মানে ওই ওই সমস্ত অঞ্চলে। তিনি মানে সেটা চাঁদের পাহাড়ের ভূমিকা পড়লেই বুঝবেন, ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে বসে ওই ভ্রমণ বৃত্তান্ত এবং ভূগোলের বইগুলো পড়েছেন। পড়ে তার এমন ব্যুৎপত্তি যে তার চোখের সামনে পুরো ভেসে উঠলো, মানে কবি-প্রতিভা। ওই অপূর্ববস্তু নির্মাণক্ষমা প্রজ্ঞা তার আছে, তার অঘটন ঘটন পটীয়সী বুদ্ধি আছে। তিনি যা লিখলেন তাতে দেখা যাচ্ছে যে সমস্ত পথের বিবরণ, ওই জায়গার বিবরণ যা দিয়েছেন সমস্ত সত্য, কোনোটাই কিন্তু মিথ্যে নয়। চাঁদের পাহাড় আমাদের কাছে সারস্বত প্রতীতি নিয়ে সত্য হয়ে উঠছে। আমরা বিশ্বাস করছি যে হ্যাঁ, এমনটা হলেও তো হতে পারে। এইটা ব্যুৎপত্তির জোরে কবি কিন্তু নির্মাণ করতে পারেন।

আর এই যে ব্যাপারের নির্মাণগুলো হচ্ছে, সেই নির্মাণগুলোর জন্য অনুশীলন চাই। অর্থাৎ শুধু প্রতিভা থাকলেই হবে না, শুধু ব্যুৎপত্তি থাকলেই হবে না। মানে প্র্যাকটিসের পর মানে প্র্যাকটিসের পর প্র্যাকটিস করে যেতে হবে। আপনি রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে ভাবুন, জীবনানন্দের ক্ষেত্রে ভাবুন। রবীন্দ্রনাথের প্রথম দিকের কবিতাগুলো ভাবুন, তারপরে রবীন্দ্রনাথ আস্তে আস্তে যে উত্তীর্ণ হচ্ছেন—মানসী আসছে, সোনার তরী আসছে, এই অংশগুলোতে যে রবীন্দ্রনাথকে আমরা পাচ্ছি, চিত্রা চৈতালিতে পাচ্ছি বা পরবর্তী যে রবীন্দ্রনাথ, তার সঙ্গে আপনি ‘কবিকাহিনী’র রবীন্দ্রনাথকে কি করে মেলাবেন? তার সঙ্গে ওই মানে পূর্ববর্তী সময়ে যে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন সেটা কি করে হচ্ছে? এই প্র্যাকটিস। প্র্যাকটিসের ফলে তিনি অন্য রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠছেন। এটা থাকতে পারে।

জীবনানন্দের ক্ষেত্রেও তাই। জীবনানন্দের প্রথম দিকের কাব্যগ্রন্থগুলো দেখুন, পরের দিকের দেখুন। অবশ্যই জীবনানন্দ সেরা কবি, আমারও খুব প্রিয় এবং পছন্দের কবি। কিন্তু এই যে বিবর্তনটা লক্ষ্য করুন, তাহলেই বুঝবেন যে এই অনুশীলনের ফলে, যেটাকে আমরা অভ্যাস বলব না, এটাকে আমরা শুধু ওই অনুশীলন শব্দ দিয়েই ব্যাখ্যা করব, যে কিভাবে তিনি শ্রেষ্ঠতর শ্রেষ্ঠতম কবি হয়ে উঠছেন। এই তিনটে গুণের সম্মেলনের মধ্য দিয়েই একজন যথার্থ কবি হন। ঠিক আছে?

বক্তা ২৩: হ্যাঁ, বুঝেছি স্যার। হ্যাঁ স্যার।

বক্তা ১: বেশ, আর কিছু বক্তব্য না থাকলে আজকে শুভরাত্রি করি?

বক্তা ৯: একটা কথা একটু জিজ্ঞেস করব, যে সাহিত্য নিয়ে রবীন্দ্র রচনাবলীতে কোথায় আছে, সাহিত্য প্রবন্ধগুলো রবীন্দ্র রচনাবলীর কোন খণ্ডে একটু বলতে পারবেন?

বক্তা ১: এটা না… এক মিনিট হ্যাঁ, আমি…

বক্তা ৯: ঠিক আছে, খুঁজেও নেওয়া যাবে। অষ্টাদশ খণ্ডে লেখা আছে…

বক্তা ১: চতুর্থ না পঞ্চম সেটা নিয়ে গুলিয়ে ফেলেছি। এক মিনিট, আমি দেখে বলছি। দেখছি। পঞ্চমেই… মানে সুলভ সংস্করণ যেটা বিশ্বভারতীর, আমার হাতের কাছে তো সেটাই আছে, আমি অন্য বলতে পারব না।

বক্তা ৯: হ্যাঁ, আমার কাছে ওটাও আছে। ওটাই আছে।

বক্তা ১: হ্যাঁ, পঞ্চমেই আছে। ঠিকই বলছি। মানে চতুর্থতে আছে। চতুর্থতে… চতুর্থ মানে সুলভ সংস্করণ রবীন্দ্র রচনাবলীর যেটা, তার চতুর্থ খণ্ডে আছে।

বক্তা ৯: আচ্ছা, ঠিক আছে।

বক্তা ২ (ব্রতদা): হ্যাঁ, দিব্যেন্দু? দিব্যেন্দু?

বক্তা ১: হ্যাঁ ব্রতদা, বলুন।

বক্তা ২: হ্যাঁ, খুব ভালো আলোচনা হয়েছে আজকে। হ্যাঁ, আমি ব্রত বলছি।

বক্তা ১: সর্বনাশ করেছে! তুমি বলছো ভালো আলোচনা হয়েছে! তোমরা সব জানো আরও বেশি, তাও ভালো। আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছ সাহিত্য!

বক্তা ২: না না, খুব ভালো আলোচনা হয়েছে আজকে।

বক্তা ১: ধন্যবাদ তোমায়। আমারও পড়া হচ্ছে সেই সূত্রে আরও বেশি করে। আমার ভালোই লাগে তত্ত্ব পড়াতে, তোমাকে আমি বহুবার বলেছি তুমি জানো সেটা। তার জন্য তোমায় ধন্যবাদ। ঠিক আছে, আজ তাহলে শুভরাত্রি। সকলে ভালো থাকুন।

বক্তা ২৪ (শ্রোত্রী): নমস্কার স্যার।

বক্তা ৭: ধন্যবাদ স্যার। খুব ভালো লাগলো।

বক্তা ২৫ (শ্রোত্রী): সত্যি, খুব ভালো লাগলো।

বক্তা ১৪: আমাদের স্যারকে যেমন ভালো পেয়েছি এত সুন্দর করে বোঝালেন, তেমনি আমাদের সহপাঠীরাও এত ভালো মানে সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করে দিচ্ছেন, এই যে মানসিকতাটা এটা খুবই ভালো লাগছে। এটা আমাদের বাড়তি পাওনা।

বক্তা ৭: সত্যি। সবসময় বইগুলো, পিডিএফগুলো সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।

বক্তা ৯: অনেক তথ্যে সমৃদ্ধ হলাম।

বক্তা ১৪: তাত্ত্বিক বিষয়গুলো উঠে আসছে তো, মানে কিছু কিছু মাথার উপর দিয়ে যাবে, কিছু কিছু সোজাসুজি যাবে। আয়ত্ত করতে পারলেই হলো। আমার মধ্যে তো কিছুটা ভয় ভয় কাজ করছে, পারব কিনা। কিন্তু খুব ভালো লাগছে। সবাইকে ধন্যবাদ।

বক্তা ২৬ (শ্রোত্রী): রেকর্ড তো করেছে নিশ্চয়ই, না কেউ? শুরুর দিকটা পেতাম যদি। ঠিক আছে, বেরোচ্ছি।

Built with LogoFlowershow